• শিরোনাম


    কুরবানির চামড়ার ব্যবহার বিধি -ম. কাজী এনাম

    | ১৭ আগস্ট ২০১৯ | ৮:২৬ অপরাহ্ণ

    কুরবানির চামড়ার ব্যবহার বিধি -ম. কাজী এনাম

    (১) কুরবানির চামড়ার হক গরিবের। এই হক্বের অগ্রাধিকার সেসব গরিব দ্বীনি কাজে ব্যস্ততম জীবন-যাপনে লেগে আছে, তাহারা। বিষেশত দ্বীনি শিক্ষায় ব্রত অসহায় ও হতদরিদ্র তালেবে ইলমের হক। আর সেই প্রেক্ষিতে দেশের সকল মাদারেসে দ্বীনিয়ায় চামড়ার কালেকশন করে থাকে। মাদ্রাসার অসহায় ছাত্রদের জন্য লিল্লা বোর্ডিং, ফ্রি ভর্তি, ফ্রি বেতন থেকে নিয়ে জামা-কাপড় সহ নানান খরচাদি এই চামড়ার অর্থে ব্যবহৃত গোরাবা ফান্ড থেকে আঞ্জাম দিয়ে আসছে। এহেন মুহুর্তে কিছু অসাধু মহল, রাজনৈতিক চামচা, পাশের দেশের দালাল সহ দ্বীন বিদ্বেষী একটা নুংড়া ও হিংসুকে চক্র দ্বীনি এহেন কার্যের বাধার সৃষ্টি করতে চামড়া ব্যবসায় সিন্ডিকেট, কালোবাজারি হস্তক্ষেপ করা শুরু করেছে। আর সেজন্য এ বছরের কুরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য মাদ্রাসার আসেনি। অনেক মাদ্রাসায় ভ্যান ভাড়াটা পর্যন্ত আসেনি। সিলেটের দারুসসালাম মাদ্রাসায় ৮২০টি চামড়া ফেলে দিতে হয়েছে, কিন্তু কেন? এছাড়াও দেশের আনাচেকানাচে অসংখ্য এমন ঘটনা ঘটেছে। যা ইতিহাসের একটা নেক্কার জনক ঘটনা। যারা বিক্রি করেছে বা করতে পেরেছে তারাও পেয়েছে হাস্যকর দাম। ন্যায্যমূল্য মুল্যের জন্যে এ বছরেও সরকার ব্যাবসায়ীদের ঋন দিয়েছে, তবুও গরিবের হকে অসাধু ব্যাবসায়ীদের কালো থাবা। এইই থাবা আমাদেরই রুখতে হবে।



    নিত্য প্রয়োজনীয় চামড়ার পণ্য-সামগ্রীর উর্ধ্বগতির সাথে চামড়ার বাজারের এই দরপতন খুবই হাস্যকর ও হতাশার। সাম্রাজ্যবাদী উগ্র হিন্দু প্রতিবেশি রাষ্ট্রের থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করাটাও বোকামি। সবচেয়ে বড় হতাশার কারন হলো নিজেদের ভেতরে কেউ এহেন সিন্ডিকেট ও ট্যানারি তৈরী করার জন্য উঠে না দাঁড়ানো। আর সেজন্যেই অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে, ভাবাই মুশকিল।

    (২)

    অদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, স্রিফ গোরাবা ফান্ডের জন্য চামড়া কালেকশনের উপর ডিপেন্ডেড না হওয়াই সময়ের দাবি। মাদ্রাসার ছাত্র-উস্তাদ কেহই ‘সিন্ডিকেট বিজন্যাস সিস্টেম’ সম্পর্কে একদমই বেওয়াকিফহাল। তাছাড়া এইধরন ব্যবসাও প্রশ্নবিদ্ধ। শরিয়াহের আওতাধীন ফেলানোর উপায় বের করা খুবই কঠিন। তবে অনেকে মিলে উদ্যোগ নিলে সম্ভাবনাগুলো অনেক ব্রাইটফুল। যদিও প্রাথমিকভাবে বাজারজাত করণ একটু কঠিন হয়ে যাবে, তথাপিও কথা থেকে যায়.. সরাসরিভাবে চামড়া বিক্রি না করে নিজেদের মাঝেই শ্রম বিভাজন কিবা ব্যবসার বিভাজনের মাধ্যমে সরাসরি চামড়ার পণ্য-সামগ্রীর দিকে নজর দেয়া। সেক্ষেত্রে আমাদের স্বকীয়তা বাহ্যিকভাবে একটু নষ্ট হলেও তৈরী হতে পারে বিশাল প্রপার্টি। সেই সাথে দ্বীনি খেদমতের সুযোগ। আমরা যখন অন্য দেশের, অন্য জাতির ব্র‍্যান্ডের চামড়ার পণ্য ব্যবহার করি, সেখানেও কিন্তু মৌলিক অর্থে আমাদের স্বকীয়তা নষ্ট হচ্ছে। বরং বেশিই নষ্ট হচ্ছে। সুতরাং নিজেদের নিয়ে ভাববার সময় এখনই। আমরা যেন আর কখনো কোন ট্যানারি কিবা সিন্ডিকেটের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে না হয়।

    (৩)

    চামড়ার ব্যবহার আদিকালের। যুগেযুগে মানুষ নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রীর জন্য চামড়া ব্যবহার করে
    আসছে। পানির মশক, জামা, টাকারথলে, ব্যাগ, জুতা, মোজা, কোট, ব্যল্ট, বিছানার চাদর, মেঝে কার্পেট, পাপোশ সহ নানান ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রী। কুরবানির চামড়া গরিবের হক ঠিক আছে, তবে সেটা যখন ন্যায্য ভাবে দেয়া সম্ভব না, থাহলে খুঁজতে হবে অন্য পন্থানুসরণ। ইসলামী শরিয়াহের আলোকে ব্যক্তিগত ভাবে কেউ চাইলে চামড়া ব্যবহার করতে পারবে। দুই নিয়মের প্রথমটায় চামড়া যেহেতু খাবার সম্ভব না, সেহেতু প্রক্রিয়াজাত করার কথাই চিন্তা করতে হবে। অন্তত মাটিতে পুতে ফেলা বা হাস্যকর দামে বিক্রি করার চেয়ে ভাল। ব্যক্তিগত ভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে চাইলে একটু খুজ নিলেই তত্ত্ব পেয়ে যাবে। কারন সরাসরিভাবে চামড়া ব্যবহারের জন্য লবনই যতেষ্ট। চামড়ার চর্বি বা লেগে থাকা গুস্তের অংশ ভালভাবে পরিস্কার করে, বেশি করে মোটা লবন ছিটিয়ে দিন। সপ্তাহ খানেক রোদে শুকালেই অসাধারণ একটা ব্যবহার্য জিনিস হয়ে যাবে। সুতরাং কেউ যেন চামড়া ফেলে না দিই। গরিবের হক আদায়ে প্রয়োজনে নিজ থেকে কিছু টাকা গরিবকে দিয়ে দিই। পঞ্চাশ হাজার টাকার গরু কিনে কেউ পাঁচশো টাকার জন্য ফকির হয়ে যায়না।

    (৪)

    ঢাকার হাজারীবাগে প্রায় দুইশটি চামড়া কারখানা আছে। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রঙ করা থেকে শুরু করে চামড়া পণ্য তৈরি হয় এখানে। এছাড়াও নানাবিধ উদ্বৃত্ত থেকে মাছ ও গবাদিপ্রাণী খাদ্যসহ তৈরি হয় আরো কত কী! এসব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয় ঝুঁকিপূর্ণ নানা রাসায়নিক উপাদান। একটি মাঝারি মানের গরুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় ত্রিশ কেজি রাসায়নিক উপাদান লাগে।
    এর ভেতর ৮ কেজি লবন ও প্রায় ২২ কেজি ক্রোমিয়াম ও এসিড। ট্যানারি দূষণের মূল তর্কটিই এই ক্রোমিয়ামকে ঘিরে। কিন্তু স্মরণে রাখা জরুরি, বিশ্বে আশি ভাগ চামড়াই ক্রোমিয়ামের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ক্রোমিয়াম সালফেট, সোডিয়াম ফরমেট, সোডা, কার্বলিক এসিড, ফরমিক এসিড, সালফিউরিক এসিডের মতো প্রায় ৩০০ রকমের রাসায়নিক উপাদান। আর এসব
    রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে ট্যানারি কারখানাগুলোতে নেই কোনোধরনের ন্যূনতম মৌলিক নীতি ও সুরক্ষা। ট্যানারি শ্রমিকেরা একেবারেই কালি হাতে পায়ে শরীরে এসব রাসায়নিক উপাদানে লেপ্টালেপ্টি হয়ে দিনরাত চামড়া প্রক্রিয়াজাত করেন। দেশের অন্যান্য কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত শিল্পের মতোই
    এখানেও রয়েছে অবিশ্বাস্য মজুরি নিরাপত্তাহীনতা এবং বৈষম্য। আর এসব বৈষম্য ও অনিয়ম রোধে চামড়া ব্যবসায় ইসলামী ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণ সময়ের দাবী।
    বিশ বছর আগেও নারী ও শিশুরা এই শিল্পে জড়িত না হলেও এখন এদের সংখ্যা অনেক। সুতরাং দেশীয় পণ্যের জন্য হউক কিবা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্যেই হউক, ইসলামপ্রিয় ব্যক্তিদের এহেন কর্মের সংশ্লিষ্টতা আবশ্যক। সেই সাথে আমাদের দেশের বেকারত্বের হার অনেকাংশ কমানোও অপরিহার্য।

    #লেখক;
    #উস্তাদ, জামিয়া কুরাআনিয়া সৈয়িদা সৈদুন্নেসা কাজীপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
    স্টাফ রিপোর্টার আওয়ার কণ্ঠ।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম