• শিরোনাম


    কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মানসিক প্রশান্তি অর্জনের উপায় [] মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস, অতিথি লেখক | ০৬ মে ২০২০ | ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ

    কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মানসিক প্রশান্তি অর্জনের উপায় [] মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    মানসিক টেনশন ফিল করে জীবনের ব্যাপারে অতিষ্ট হয়ে পড়ে- সমাজে এমন মানুষের
    সংখ্যা অনেক। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের জীবনে ছন্দ আনতে
    ব্যর্থ হয়ে যান। শাইখ আব্দুর রহমান বিন নাসের আস-সাদী রহ. মানসিক রোগের
    প্রতিষেধক হিসেবে চমৎকার একটি কিতাব লিখেছেন। গ্রন্থের নাম হলো- (الوسائل
    المفيدة للحياة السعيدة) ।
    বিশ্বখ্যাত অনলাইন-অফলাইন লাইব্রেরী মাকতাবায়ে শামেলায় এর সংক্ষেপকরণ-পূর্বক “وداعاً للأمراض النفسية و ضيق الصدر ’’
    শিরোনামে একটি প্রবন্ধের উল্লেখ রয়েছে। বক্ষ্যমাণ লেখাটি ওই আরবী প্রবন্ধেরই
    অনূদিত, পরিমার্জিত ও সংযোজিত রূপ। গ্রন্থোল্লিখিত টিপসগুলো প্রায়োগিকভাবে
    গুণীজনের কাছে অত্যন্ত উপকারী সাব্যস্ত হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত
    হলো:
    ১. তাওহীদ ও হিদায়াতের দ্যুতি হৃদয়ে ধারণ করা। কেননা, যেমনিভাবে শিরক ও
    পথভ্রষ্টতার অন্ধকার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেয়, ঠিক এর বিপরীতে তাওহীদের আলো
    হৃদয়ে নিয়ে আসে প্রশান্তির ছোঁয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
    قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ * يَهْدِي بِهِ اللَّهُ
    مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ
    إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
    [المائدة:15-16
    তোমাদের কাছে একটি উজ্জল জ্যোতি এসেছে এবং একটি সমুজ্জল গ্রন্থ। এর দ্বারা
    আল্লাহ তাআলা যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন
    করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। এবং
    সরল পথে পরিচালনা করেন।
    -[ সুরা মায়েদা১৫ -১৬]

    ২. উপকারী জ্ঞান অর্জন করা। কারণ, মানুষের জ্ঞানের প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে
    বক্ষও সম্প্রসারিত হয়। আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
    قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
    إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
    বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল
    তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। -( সূরা যুমার 9)



    ৩. আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণ একাগ্রতার সাথে মনোনিবেশ করা এবং আখেরাতের কথা
    স্মরণে রেখে ইবাদাতে স্বাচ্ছন্দ্যের বিকাশ ঘটাতে প্রয়াসী হওয়া।
    আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
    *واتبع سبيل مَنْ أناب إلي
    যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। -(সূরা লোকমান ১৫)

    নিম্নোক্ত হাদীসখানা ভালোভাবে অনুধাবন করুন:
    سئل النبي صلى الله عليه وسلم عن هذه الآية: { فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ
    يَهدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ
    لِلإسْلامِ } وقالوا: كيف يشرح صدره يا رسول الله؟ قال: “نور يُقْذَف فيه،
    فينشرح له وينفسح”. قالوا: فهل لذلك من أمارة يُعرف بها؟ قال: “الإنابة إلى
    دار الخُلُود، والتَّجَافِي عن دار الغرور، والاستعداد للموت قبل لقاء الموت”
    (1)
    (1) تفسير عبد الرزاق (1/210) ورواه الطبري في تفسيره (12/99) من طريق عبد
    الرزاق به
    রাসূল সা.-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, -অর্থ:“সুতরাং আল্লাহ্‌ কাউকে
    সৎপথে পরিচালিত করতে চাইলে তিনি তার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন” –সাহাবায়ে
    কেরাম প্রশ্ন করলেন, কীভাবে তার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করেন? তিনি
    বললেন, “একটি
    আলো প্রক্ষিপ্ত করা হয়, যার ফলে বক্ষ সম্প্রসারিত হয়ে যায়।” তারা বললেন, এর
    কোন নিদর্শন আছে? নবীজী সা. বললেন, নিদর্শন হলো- আখেরাতের প্রতি পূর্ণ
    একাগ্রতার সাথে মনোনিবেশ করা, দুনিয়াবিমুখতা ও সময় থাকতেই মৃত্যুর প্রস্তুতি
    নেয়া।”

    ৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার যিকর জারি রাখা। বিশষজ্ঞদের মতে, অন্তরের
    প্রফুল্লতা আনয়ন ও দুশ্চিন্তা দূরীকরণে যিকরের বিস্ময়কর প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ
    তাআলা বলেন,
    { أَلا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ} [الرعد:28]
    জেনে রাখ, আল্লাহ তাআলার যিকিরের মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয়।।

    ৫. প্রতিটি সৃষ্টিজীবের সাথে সদয় আচরণ করা। নম্রতা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি
    সাধারণত সুখীই হয়ে থাকে।
    قَالَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- :« يَا عَائِشَةُ عَلَيْكِ بِالرِّفْقِ
    فَإِنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِى شَىْءٍ إِلاَّ زَانَهُ وَلَمْ يُنْزَعْ مِنْ شَىْءٍ
    إِلاَّ شَانَهُ ». أَخْرَجَهُ مُسْلِمٌ فِى الصَّحِيحِ

    (21316 السنن الكبرى)
    রাসূল সা. বলেন, হে আয়েশা! নম্রতা অবলম্বন করো। কারণ, তা জিনিসকে
    সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, আর এর অনুপস্থিতি বস্তুকে ত্রুটিযুক্ত করে ‍দেয়।।

    ৬. নিজকে একজন বীর-বাহাদুর হিসেবে আবিষ্কার করা। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা.
    কাপুরুষত্ব থেকে পানাহ চাইতেন।
    وروينا عن سعد بن أبي وقاص وأنس بن مالك عن النبي صلى الله عليه و سلم أنه كان
    يتعوذ من الجبن
    18341 الكتاب: سنن البيهقي الكبرى

    ৭. আভ্যন্তরীণ দোষসমূহ থেকে পবিত্র থাকা, যেগুলো অন্তরকে সংকীর্ণ ও পীড়িত করে। যথা: হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও ঔদ্ধত্য ইত্যাদি।
    عن أنس بن مالك أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال : لا تباغضوا ولا تحاسدوا ولا تدابروا وكونوا عباد الله إخوانا
    398 الكتاب: الأدب المفرد
    রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, পরস্পরে হিংসা করো না, পরস্পরে বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হয়ো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও।।

    ৮. অধিক কথা বলা, খাওয়া, ঘুম ও মানুষের সাথে সংমিশ্রণ পরিহার করতে হবে। এর দ্বারা সকল দুশ্চিন্তার বিনাশ ঘটবে। আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
    {وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ} [الأعراف:31]
    তোমরা পানাহার করো। অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।
    كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ
    17 الذاريات)
    তাঁরা (আল্লাহর প্রিয় বান্দারা) রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করতেন।

    ৯. বর্তমান কাজে গুরুত্বারোপ করা। আগামী দিন কী হবে- তা নিয়ে অযথা টেনশন ফিল না করা এবং অতীতকে স্মরণ করে দুশ্চিন্তা করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ সা. এ বলে দোআ করতেন, “اللهم إني أعوذ بك من الهم و الحزن” হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পানাহ চাই ভবিষ্যৎ ও অতীতের পেরেশানী থেকে।।

    ১০. ঐশ্বর্য, সুস্থতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপরস্থ কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা যাবেনা। বরং নিম্নমানের ব্যক্তিকে দেখে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগ্রত করতে হবে। রাসূল সা. বলেন,
    قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : ( أنظر إلى من هو دونك ولا تنظر إلى من هو فوقك فإنه أجدر أن لا تزدري نعمة الله عندك
    الكتاب : المعجم الكبير 1651
    তোমার চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করো। উপরস্থ কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ করো না। কেননা, এটা করলে আল্লাহ তাআলার নেয়ামতকে তোমার কাছে খাটো মনে হবে না।

    ১১. খারাপ ভাবনা-সৃষ্ট বিভিন্ন অনর্থক ধ্যান-ধারণাকে দৃঢ় মনোবল, ধৈর্য ও সহনশীলতা দ্বারা মোকাবেলা করতে হবে। হতাশ হয়ে কোন অনিষ্টকে অন্তরে স্থান দেয়া যাবেনা। বরং দোআ ও চেষ্টার পাশাপাশি সকল বিষয়কে আল্লাহ তাআলার সোপর্দ করতে হবে। আল-কুরআনের বাণী:
    اِنَّ اللهَ مَعَ الصّٰبِرِیْن
    নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে রয়েছেন। -সূরা বাকারা: ১৫৩

    ১২. আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা ও তাওয়াক্কুলকে অন্তরঙ্গ বানাতে হবে। আল্লাহর উপর ভরসা যার হৃদয়ে থাকে, তাকে কোন অযাচিত দুশ্চিন্তা কাবু করতে পারে না।
    وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ (الطلاق3
    যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।।
    قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن الله يقول أنا عند ظن عبدي في
    2388 سنن الترمذي
    রাসূল সা. বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার ব্যাপারে বান্দার ধারণা অনুযায়ীই আচরণ করি।।

    ১৩. জীবনের পথচলায় কোন পেরেশানী আসলে, দ্বীনী-দুনিয়াবী নিয়ামতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করবে। তাহলে স্বভাবতই দেখবে, অসংখ্য নিয়ামতরাজীর তুলনায় তার দুঃখ-কষ্ট খুবই নগন্য। আর অধিক পরিমাণে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহের আলোচনা করে যাওয়া। কেননা, এর অনুভূতি ও আলোচনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সান্ত্বনার পরশ দিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

    وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
    الضحى11
    আর তুমি তোমার পালনকর্তার অনুগ্রহের কথা বর্ণনা কর ।।

    ১৪. নেতিবাচক সব চিন্তা পরিত্যাগ করে, উভয় জাহানের উপকারী বিষয় অর্জনে ভাবনার জগতে বিচরণ করবে। রাসূল সা. বল
    احرص على ما ينفعك واستعن بالله
    2612 الكتاب : الجمع بين الصحيحين البخاري ومسلم
    উপকারী বস্তুর প্রতিই আগ্রহী হও। এবং আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করো।।

    ১৫. সর্বোপরি সুষ্ঠু জীবনের জন্য কায়মনোবাক্যে দোআ করতে হবে। এ বিষয়ে নিম্নোক্ত দোআটি খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ:
    اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي
    أَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي – وَأَصْلِحْ لِي و
    آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي – وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِي
    فِي كُلِّ خَيْرٍ – وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِي مِنْ كُلِّ شَرٍّ
    হে আল্লাহ! আমার দ্বীনকে আমার জন্য সঠিক করে দিও যা কর্মের বন্ধন। দুনিয়াকেও আমার জন্য সঠিক করে দাও যেখানে রয়েছে আমার জীবন যাপন। আমার জন্য আমার পরকালকে পরিশুদ্ধ করে দাও, যা হচ্ছে আমার অনন্তকালের গন্তব্যস্থল। প্রতিটি ভাল কাজে আমার জীবনকে বেশী বেশী কাজে লাগাও এবং সকল অমঙ্গল ও কষ্ট থেকে আমার মৃত্যুকে আরামদায়ক করে দিও। – ( সহীহ মুসলিম, ২৭২০)

    প্রসঙ্গক্রমেই বলতে হচ্ছে, অন্যান্য ভাষার মতো বাংলা ভাষায়ও মানসিক প্রশান্তি বিষয়ক বহু দ্বীনি কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে মৌলিক ও অনূদিত উভয়প্রকারের বই রয়েছে। পাঠকের উপকারের কথা ভেবে কয়েকটি গ্রন্থের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো:
    ১. হতাশ হবেন না, মূল: ড.আয়েয আল-কারনী
    ২. সুখময় জীবনের সন্ধানে, মূল: শাইখ মুহাম্মাদ আল-আরিফী
    ৩. আত্মার ব্যাধি ও তার প্রতিকার, মূল: মাওলানা শাহ হাকিম ‍আখতার রহ.
    ৪. ইসলামী মনোবিজ্ঞান, মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন
    ৫. জীবন পথে সফল হতে, মূল: শাইখ ড. আব্দুল কারীম বাক্কার
    ৬. বেলা ফুরাবার আগে, আরিফ আজাদ

    লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস
    প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক:
    শাহবাজপুর, বি-বাড়িয়া, বাংলাদেশ।
    ১১ রমজান, ১৪৪১ হিজরী।।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    নিয়ত অনুসারে নিয়তি ও পরিনতি

    ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম