• শিরোনাম


    কুরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে বজ্রপাতের কারণ: এস এম শাহনূর

    | ১৭ জুলাই ২০১৯ | ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ

    কুরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে বজ্রপাতের কারণ: এস এম শাহনূর

    বজ্রপাত মহান আল্লাহ পাকের নেয়ামত
    অবিশ্বাসীদের জীবনে আনে কেয়ামত।
    ★বজ্রপাত বলতে বিকট শব্দ সহকারে চোঁখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানিকে বুঝায়।এর শাব্দিক অর্থ ভূমিতে বিদ্যুৎ পতিত হওয়া”।আমাদের দেশে একে ঠাডাও বলা হয়ে থাকে।

    ★বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাঃ
    জলীয়বাষ্প ঘণীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়।পানিচক্রে জলকণা যখন ক্রমশ উর্ধ্বাকাশে উঠতে থাকে তখন তারা মেঘের নিচের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষার কণার সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। যার ফলে উপরের দিকে উঠতে থাকা অনেক বাষ্প পরমাণু বেশ কিছু ইলেকট্রন হারায়। যে পরমাণু ইলেকট্রন হারায় তা পজিটিভ চার্জে এবং যে পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ করে তা নেগেটিভ চার্জে চার্জিত হয়। অপেক্ষাকৃত হাল্কা পজিটিভ চার্জ থাকে মেঘের উপর পৃষ্ঠে এবং ভারী নেগেটিভ চার্জ থাকে নিচের পৃষ্ঠে। যথেষ্ট পরিমাণ পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জ জমা হওয়ার পর পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণের দরুণ electrostatic discharge প্রক্রিয়া শুরু হয়। discharge তিন ভাবে হতে পারে-
    (ক) মেঘের নিজস্ব পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জের মধ্যে
    (খ) একটি মেঘের পজেটিভ (+) কিংবা নেগেটিভ (-) চার্জের সাথে অন্য মেঘের নেগেটিভ (-) কিংবা পজেটিভ (+) চার্জের সাথে
    (গ) মেঘের পজেটিভ (+) চার্জের সাথে ভূমির Discharge হওয়ার সময় পজেটিভ (+) চার্জ থেকে নেগেটিভ (-) চার্জের দিকে বাতাসের মধ্য দিয়ে স্পার্ক আকারে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। এ ঘটনাই হল বজ্রপাত।



    ★পবিত্র কুরআনের আলোকে বজ্রপাতের কারণঃ
    *বজ্রপাতের নামে নাজিলকৃত সূরার নাম
    ‘সূরা- রদ।’ ১৩ নম্বর পারা, ১৩ নং সূরা।

    *বজ্রপাতের কারণ হিসেবে পবিত্র
    কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন
    বলেছেন -দেশে যুলুম অত্যাচার অতি মাত্রায়
    বেড়ে গেলে বজ্রপাত হয়। সূরা নিসা,
    আয়াত-১৫৩।

    *বজ্রপাত আল্লার গজবের প্রমাণ। সূরা
    আনকাবুত, আয়াত-৪০।

    *আল্লার বিধান অমান্য করার কারণেই
    বজ্রপাত হয়। যুলুম-অত্যচার ও গুণাহের কাজ
    যত বাড়বে বজ্রপাত তত বাড়বে। সূরা
    যারিয়াত, আয়াত-৪৪।

    *বজ্রপাত আল্লাহ গজবের স্পষ্ট প্রমাণ।
    সূরা তুর, আয়াত ৪৫।
    *অতএব বজ্রপাত প্রতিহত করার বা রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা আল্লাহপাকের নির্দেশ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা ছাড়া কোন উপায় নেই।

    ইদানিং বজ্রপাত বেড়ে গেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সতর্ক করে থাকেন।
    পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে জীন ও মানুষ ছাড়া সৃষ্টির সবকিছু সর্বদা আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকে। সুরা রাদের ১৩ নম্বর আয়াতে বজ্রপাত সম্পর্কে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, ফেরেশতা ও আসমানে থাকা বজ্র সর্বদা আল্লাহর প্রশংসায় মত্ত থাকেন। অত:পর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে বজ্র দ্বারা আঘাত করেন।

    ★ পবিত্র কুরঅানের ১১৪টি সুরার মধ্যে সুরা-অার রা’দ(১৩তম)একটি।যার বাংলা অর্থ বজ্রপাত বা ঠাডা।
    ★সূরা রা’দের ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
    ﻟَﻪُ ﻣُﻌَﻘِّﺒَﺎﺕٌ ﻣِﻦْ ﺑَﻴْﻦِ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﻭَﻣِﻦْ ﺧَﻠْﻔِﻪِ ﻳَﺤْﻔَﻈُﻮﻧَﻪُ ﻣِﻦْ ﺃَﻣْﺮِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﻐَﻴِّﺮُ ﻣَﺎ ﺑِﻘَﻮْﻡٍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳُﻐَﻴِّﺮُﻭﺍ ﻣَﺎ ﺑِﺄَﻧْﻔُﺴِﻬِﻢْ ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺃَﺭَﺍﺩَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺑِﻘَﻮْﻡٍ ﺳُﻮﺀًﺍ ﻓَﻠَﺎ ﻣَﺮَﺩَّ ﻟَﻪُ ﻭَﻣَﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﻣِﻦْ ﺩُﻭﻧِﻪِ ﻣِﻦْ ﻭَﺍﻝٍ ‏( ১১)
    “মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে, তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। আল্লাহ অবশ্যই কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে। কোন সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ যদি অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তবে তা রদ করার কেউ নেই। এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোন অভিভাবক নেই।” (১৩:১১)
    এর আগে বলা হয়েছে, সৃষ্টি জগতের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যা কিছু আছে সব কিছুই আল্লাহ জানেন। কোন কিছুই তাঁর অজানা নয়। এই আয়াতে বলা হচ্ছে ,আল্লাহ তা’লা প্রত্যেক মানুষের জন্য একজন ফেরেশতা নিয়োজিত করেছেন,এই ফেরেশতা মানুষকে নানা বিপদাপদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করে। বিশ্ব প্রকৃতি আল্লাহরই সৃষ্টি এবং আল্লাহরই বেধে দেয়া নিয়মে প্রকৃতির সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই প্রকৃতিতে যে সব ঘটনা বা দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, তা আল্লাহর ইচ্ছায়ই হয়ে থাকে। ফলে প্রকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে ফেরেশতারাই মানুষকে রক্ষা করে।
    এ আয়াতে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, বলা হয়েছে প্রকৃতিতে কোন কিছু সংঘটিত করার শক্তি বা সামর্থ মানুষের নেই, কিন্তু মানুষকে তার ভাগ্য গড়ার সামর্থ দেয়া হয়েছে। সেটি ব্যক্তিগত হোক কিংবা সামাজিক হোক, মানুষ তার ভবিষ্যত বিনির্মাণের ক্ষেত্রে সামর্থবান। এটা প্রত্যাশা করা উচিত নয় যে, মানুষের ভাগ্য গড়ে দেয়ার জন্য আল্লাহপাক ফেরেশতা নিয়োগ করবেন। মানুষ যদি তার ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে সফলতা আনতে চায় তাহলে এজন্য তাকেই উদ্যোগী হতে হবে, নৈরাজ্য পরিহার করে সঠিক পথে চলার উদ্যোগ নিতে হবে এবং জুলুম-অত্যাচারের মূলোৎপাটন করে ন্যায়পরায়নতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অলৌকিকভাবে আদর্শ সমাজ বা আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে উঠে না,এজন্য মানুষকেই সম্মিলিতভাবে সচেষ্ট হতে হবে।
    এ ক্ষেত্রে ঐশী নিয়মের কথাও এই আয়াতে ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোন জাতি যতক্ষণ না নিজেরা নিজেদের উন্নতির জন্য সচেষ্ট হয় ততক্ষণ আল্লাহও তাদের উন্নতি নিশ্চিত করেন না। আবার এটাও বলা হয়েছে,যারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হয় না তারা সমুহ বিপদে নিমজ্জিত হয় এবং ঐশী শাস্তিও তাদেরকে গ্রাস করে। যদি কেউ বা কোন জাতি এ অবস্থায় উপনিত হয় তাহলে কারো সাহায্যই তাদের কাজে আসে না।
    জনগণের প্রচেষ্টায়ই প্রত্যেক জাতি বা রাষ্ট্রের উন্নতি সাধিত হয়। জনগণ যখন আল্লাহর উপর নির্ভর করে নিজেদের ভাগ্য গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে তখন মহান আল্লাহ তাদেরকে সেই সামর্থ দিয়ে সাহায্য করেন।
    এই সূরার ১২ ও ১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
    ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻳُﺮِﻳﻜُﻢُ ﺍﻟْﺒَﺮْﻕَ ﺧَﻮْﻓًﺎ ﻭَﻃَﻤَﻌًﺎ ﻭَﻳُﻨْﺸِﺊُ ﺍﻟﺴَّﺤَﺎﺏَ ﺍﻟﺜِّﻘَﺎﻝَ ‏( ১২‏) ﻭَﻳُﺴَﺒِّﺢُ ﺍﻟﺮَّﻋْﺪُ ﺑِﺤَﻤْﺪِﻩِ ﻭَﺍﻟْﻤَﻠَﺎﺋِﻜَﺔُ ﻣِﻦْ ﺧِﻴﻔَﺘِﻪِ ﻭَﻳُﺮْﺳِﻞُ ﺍﻟﺼَّﻮَﺍﻋِﻖَ ﻓَﻴُﺼِﻴﺐُ ﺑِﻬَﺎ ﻣَﻦْ ﻳَﺸَﺎﺀُ ﻭَﻫُﻢْ ﻳُﺠَﺎﺩِﻟُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﻫُﻮَ ﺷَﺪِﻳﺪُ ﺍﻟْﻤِﺤَﺎﻝِ ‏( ১৩)
    “তিনিই তোমাদেরকে বিজলী দেখান-যা ভয় ও ভরসা সঞ্চার করে এবং তিনি সৃষ্টি করেন ঘন মেঘমালা।” (১৩:১২)
    “বজ্র নির্ঘোষ ও ফেরেশতারা সভয়ে তাঁর সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে আঘাত করেন, তারপরও তারা আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে। যদিও তিনি মহাশক্তিশালী।” (১৩:১৩)
    বজ্রপাত এবং আকাশে মেঘের গর্জন মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করলেও প্রকৃতপক্ষে তা আল্লাহর নেয়ামত বা অনুগ্রহের বার্তাই বহন করে। কারণ এর মাধ্যমেই বৃষ্টিপাতের সূচনা হয়। আর এই বৃষ্টির পানিই বৃক্ষ-তরুলতা এবং মানুষ ও জীবজন্তু বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপকরণ।
    বজ্র নিনাদ বা মেঘের গর্জন প্রকৃতিরই নিয়ম। মহান আল্লাহই প্রকৃতির জন্য এই নিয়ম নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে বজ্র নিনাদের মাধ্যমে প্রকৃতি মহান আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য,তাঁর পরিপূর্ণতা এবং মহিমা বর্ণনা করে থাকে। এছাড়া, মেঘমালা সৃষ্টি এবং বৃষ্টিপাত ঘটানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতারা মেঘের গর্জনের ফলে সৃষ্ট আতঙ্কে আরো বেশি আল্লাহর মহিমা কীর্তন করে।
    এ সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সংঘটিত হয়,তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত বজ্রপাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

    ★ বজ্রপাতের সময় মহানবী (স:) একটি আয়াত পাঠ করতে বলেছেন।সাহাবী হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মেঘের গর্জন শুনতেন তখন কথাবার্তা ছেড়ে দিতেন এবং এ আয়াত পাঠ করতেন-
    ★ উচ্চারণ : সুবহানাল্লাজি ইউসাব্বিহুর রা`দু বিহামদিহি ওয়াল মালা-ইকাতু মিন খি-ফাতিহি।
    ★ অর্থ : আমি সেই সত্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, যার পবিত্র ঘোষণা করছে মেঘের গর্জন তাঁর
    প্রশংসার সাথে। আর ফেরেশতাকুল প্রশংসা করে
    ভয়ের সাথে। (মুয়াত্তা মালেক, মিশকাত)

    প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য গুলোর মধ্যে একটি হল বজ্রপাত। এটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর একটিও বটে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বজ্রপাতের
    সময় উপরোক্ত আয়াত পাঠের তাওফিক দান করুন। আমিন।

    💻এস এম শাহনূর
    (উইকিপিডিয়ান,কবি ও গবেষক)

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম