• শিরোনাম


    কসবার গুণিজন প্রফেসর আ ন ম আব্দুল মান্নান খান রহ. এর ১২ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

    লেখক: শেখ মো. কামাল উদ্দিন | ০৩ আগস্ট ২০২১ | ১২:০২ অপরাহ্ণ

    কসবার গুণিজন প্রফেসর আ ন ম আব্দুল মান্নান খান রহ. এর ১২ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

    আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বরেণ্য শিক্ষাবিদ, খ্যাতনামা লেখক, গবেষক, বহুভাষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অধ্যাপক আ ন ম আবদুল মান্নান খান ১ আগস্ট ২০০৯ সালে ইন্তিকাল করেন।
    তিনি ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ সাবেক বৃহত্তর কুমিল্লার বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দাবাদ আদর্শ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম।
    আ ন ম আবদুল মান্নান খান সৈয়দাবাদ জামিয়া ছানী ইউনুছিয়া মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং তথায় তিনি ইসলাম ধর্মশিক্ষাসহ আরবি পড়া ও লেখার নিয়মাবলি রপ্ত করেন। মাদরাসায় তাঁর মেধা ও প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে। তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে ধর্মীয় বিষয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যান এবং মৌলিক জ্ঞানচর্চা আর নিরলস সাধনার জোরে অল্পদিনের মধ্যে আরবি ভাষাতত্ত্ব ও কাব্য সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জন করেন। সহপাঠীদের মধ্যে অতুলনীয়ভাবে প্রথম স্থান অধিকার করায় সৈয়দপুর মাদরাসায় তিনি মাসিক বৃত্তিসহ বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগলাভ করেন এবং বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে ওল্ড স্কীম সিনিয়র মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ২য় স্থান লাভ করে বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। ১৯৫৫ সালে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম ও ১৯৫৭ সালে ফাযিল পরীক্ষায় ১ম বিভাগে এবং ১৯৫৯ সালে ইংরেজি ও গণিত বিষয় নিয়ে ঢাকা মাধ্যমিক বোর্ড থেকে হাই মাদরাসা সার্টিফিকেট লাভ করেন। তৎকালে বাঙালি ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনীহা লক্ষ্য করলেও তিনি মনে করতেন, ‘কোনো শিক্ষাই ধর্মবিরোধী নয়।’ অতঃপর ১৯৬০ সালে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ১ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন।
    তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা বোর্ডের অধীনে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ১ম বিভাগে ৪র্থ স্থান, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় ইংরেজি ও অর্থনীতি সাবসিডিয়ারি বিষয়সহ ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান ও কলা অনুষদে সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়ায় ডাবল স্বর্ণপদক লাভের কৃতিত্ব অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ আরবি বিষয়ে ফাইনাল পরীক্ষায় ১ম শ্রেণীতে ২য় স্থানপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৭-১৯৭৯ সালে সুদানের খার্তুম আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউট থেকে এম এ (থিসিস) ও অনারবদের আরবি ভাষা শিক্ষাদানে বিশেষজ্ঞ ডিপ্লোমা সনদলাভ করেন। এছাড়াও তিনি ইরানিয়ান কালচারাল সেন্টার থেকে আধুনিক ফারসি ভাষায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের অধীনে ‘Tarkish Contribution to Arabic Literature’ শিরোনামে পিএইচডি গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
    এ গুণধর ব্যক্তি ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি বরিশালের চাখার ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজে আরবি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং সেখানে সফলভাবে ১ বছরেরও অধিককাল অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের ২২ জুন সিনিয়র লেকচারার পদে নিয়োজিত হন এবং ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন সহকারি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। তিনি ১৯৬৭-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত হাজী মুহাম্মদ মোহসীন হলের পূর্ণকালীন হাউস টিউটর ও কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৭ সালে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য আরব লীগের বৃত্তি নিয়ে শিক্ষা ছুটিতে খার্তুম গমন করেন এবং ১৯৭৯ সালে কৃতিত্বের সাথে ডিগ্রি নিয়ে নিজ বিভাগে ফিরে আসেন। ১৯৮০ সালে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে রূপান্তরিত হলে তিনি আরবি বিভাগে কর্মরত থাকেন। তিনি ১৯৮৯ সালের ১২ মার্চ সহযোগি অধ্যাপক পদে নিয়োজিত হন এবং ১৯৯২ সালের ৫ জুলাই থেকে ১৯৯৫ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত তিন বছর ওই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে আরবি বিভাগের প্রফেসর হিসেবে কর্মরত থেকে তিনি এল পি আর শেষে ২০০৯ সালের ৩০ জুন অবসর গ্রহণ করেন।
    তার কর্মব্যাপকতা ছিল অপরিসীম। তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতারের বহিঃর্বিশ্ব কার্যক্রমের আরবি অনুষ্ঠানে নিয়মিত আরবি সংবাদপাঠক হিসেবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসারদের আরবি ভাষার খন্ডকালীন প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো পত্রিকার ধর্ম বিষয়ক কলাম লেখক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি জার্নালের সম্পাদক/প্রধান সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, লিবিয়া, সুদান, ইরান, পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশে আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশ গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনাকালে শত সহস্র ছাত্র ও অনুসারি তাঁর দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁর অধিক স্নেহের ছাত্র কর্ণেল এ এস এম রফিকুল ইসলাম অশ্রু মাখা নয়নে তাঁর স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁর ছাত্র ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান ছুটে গিয়েছেন স্যারের গ্রামের বাড়ী সৈয়দাবাদে তাঁর কবর পাশে।
    আড়াইবাড়ী দরবার শরীফের মরহুম পীরে কামেল আল্লামা হযরত মাওলানা মরহুম গোলাম হাক্কানী (র) এর সাথে তাঁর আপ্যায়নে অধ্যাপক মাওলানা এ বি এম গোলাম কিবরিয়া সাঈদীসহ বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের বাসায় আমন্ত্রণে যোগদান করেছিলাম।
    তাঁর ইন্তিকালের সংবাদ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-ছাত্রী, ভক্ত-অনুসারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারি, রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এক নজর দেখার জন্য ভেঙে পড়েন।
    মরহুমের লাশ সৈয়দাবাদে অধিক রাতে এসে পৌঁছলে সেখানেও জনগণ বাঁধভাঙ্গা অংশগ্রহণ করেন। তাঁর স্নেহের ছাত্র মরহুম আল্লামা গোলাম সারোয়ার সাঈদী (র) এর সাথে এসে স্যারের জানাযায় শরীক হতে পেরে আমি কৃতার্থ।

    লেখক: প্রভাষক ও কলামিস্ট।



    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম