• শিরোনাম


    কলম্বাস নায়ক নয়, গণহত্যাকারী।

    | ০৯ অক্টোবর ২০১৮ | ৫:২২ অপরাহ্ণ

    কলম্বাস নায়ক নয়, গণহত্যাকারী।

    আজ অ্যামেরিকায় কলম্বাস ডে—কলম্বাসের অ্যামেরিকা আবিষ্কারের* উদযাপন। কিন্তু অ্যামেরিকায় তো তার আগে থেকেই মানুষ ছিল; কলম্বাস আবিষ্কার করল কিভাবে? এই অত্যাচারী ইতরটাকে পৃথিবীর বেশিরভাগ ইতিহাস বইয়ে হিরো হিসাবে দেখানো হয়, কিন্তু আদতে ডাকাত এবং খুনীর চাইতে বেশি কিছু ছিল না কলম্বাস।

    রেনেসা যুগের স্পেন তখন নতুন ক্যাথলিক হয়ে, ইহুদী আর মুসলমানদের বের করে দিয়ে সবে নতুন করে গড়ে উঠছে। তাদের তখন সোনা দরকার, কারন সোনা হাতে থাকা মানে সারা পৃথিবীকে কিনে নেয়ার ক্ষমতা থাকা। এর আগে মার্কো পোলো আর অন্যান্য পরিব্রাজকেরা এশিয়া থেকে দামী দামী সব উপহার নিয়ে ফিরেছিলেন। কিন্তু তারা সব গিয়েছিলেন পায়ে হেটে বা ঘোড়ায় চড়ে। তুর্করা ভূমধ্যসাগর আর বর্তমান টার্কি দখল করে ইউরোপ থেকে এশিয়াতে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে, তাই সমুদ্রপথে যাওয়ার একটা নতুন রাস্তা খুঁজে পাওয়া খুব জরুরী হয়ে গিয়েছিল। তাই ইতালিয়ান কলম্বাস নিজের দেশে পাত্তা না পেয়ে স্পেনের রাজা আর রাণীকে বোঝালো, এশিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে সে জাহাজ ভর্তি করে সোনা এনে দেবে।



    সোনা আর এশিয়ান মশলা (যার দাম ইউরোপে সোনার মতই ছিল) এনে দেয়ার বদলে স্পেনের সাথে কলম্বাসের চুক্তি হলো, সে লাভের ১০% পাবে, তাকে গভর্নর বানানো হবে নতুন দেশের, আর তাকে মহাসমুদ্রের অ্যাডমিরাল খেতাব দেয়া হবে। এই চুক্তিতেই কলম্বাস বের হলো ইন্ডিয়া যাওয়ার নতুন সমুদ্রপথের খোঁজে।

    কলম্বাসের ছোট তিনটা জাহাজ নিয়ে ভারত পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব ছিল না, কিন্তু কলম্বাস সেটা জানতো না—পৃথিবীকে সেই সময় মানুষ আরো অনেক ছোট বলে ভাবতো। ১৪৯২ সালের অক্টোবরের কোন এক দিন কলম্বাসের নাবিকরা পানিতে ডালপালা আর আকাশে পাখি দেখতে পেল—অর্থাত আশেপাশেই কোথাও মাটি আছে। তারপর ১২ তারিখে রডরিগো নামে এক নাবিক সাদা বালুতে চাঁদের আলোর ঝিকিমিকি দেখতে পেল। স্পেনের রাজা-রানী বলেছিল, প্রথম মাটি দেখতে যে পাবে, তাকে আজীবন বছরে ১০,০০০ মারাভেদিস (স্পেনের মুদ্রা) পেনশন দেয়া হবে। রডরিগো কিন্তু সেই টাকা পায় নি—কলম্বাস দাবী করল, আগের রাতেই সে এই আলো দেখেছে, তাই পুরষ্কারটাও তারই হয়ে গেল। এই রকম ছ্যাচড়ামি যে করতে পারে, তাহলে টন-টন সোনার লোভে সে কি করবে?

    দ্বীপটার দিকে কলম্বাসের জাহাজ এগিয়ে গেল, আর সেই দ্বীপের আদিবাসি আরোয়াকরা সাতার কেটে এগিয়ে এলো নতুন অতিথিদের বরণ করতে। সরল আদিবাসীরা সাথে করে নিয়ে এলো খাবার, পানি আর অন্যান্য উপহার।

    কলম্বাস জাহাজের লগ (দিনপঞ্জি)তে লিখেছিল,
    “তারা … আমাদের জন্য তুলো, বর্শা, তোতাপাখি এবং অন্যান্য উপহার নিয়ে এসেছিল। আমরা সেগুলির বদলে তাদেরকে কাঁচের পুতি আর ঘন্টা দিলাম। তারা সুঠাম দেহের অধিকারী, কিন্তু তারা অস্ত্র চেনে না। আমাদের তলোয়ার যখন তাদেরকে ধরতে দিলাম, তারা সেটা নাড়াচড়া করতে গিয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলল। তারা লোহা ব্যবহার শেখে নি—তাদের বর্শাগুলি বাঁশ দিয়ে তৈরি। এদেরকে সহজেই ক্রীতদাস করে রাখা যাবে… মাত্র পঞ্চাশজন লোক দিয়ে এদের হাজার হাজার লোককে আমরা নিয়ন্ত্রন করতে পারব”

    তারপর কলম্বাস কি করল? এই সহজ সরল মানুষগুলির মধ্যে থেকে কিছু লোককে সে বন্দী করে তাদেরকে অত্যাচার করা শুরু করল সোনার খোঁজে। তাদেরকে নিয়ে কলম্বাস বর্তমান কিউবা, তারপর হিসপানিওয়ালা (বর্তমান হেইতি আর ডমিনিকান রিপাবলিক) এ গেল। নদীতে পানিতে সোনার কুচি পেয়ে কলম্বাসের লোভ আরো বেড়ে গেল। সেখান থেকে আরো বন্দী ধরে নিয়ে কলম্বাস দুইটা জাহাজ নিয়ে স্পেনের দিকে ফিরে গেল। কিন্তু বন্দীদের অনেকেই ইউরোপের শীতে মারা যেতে থাকল।

    স্পেনের রাজপ্রাসাদে কলম্বাস সত্যি-মিথ্যে মিলিয়ে একটা রিপোর্ট দিল। সে বলল, সে এশিয়া (আসলে কিউবা), আর চীনের উপকুলে একটা দ্বীপ (আসলে হিসপানিওয়ালা) পর্যন্ত পৌছেছে। সে বলল, “উপকুলগুলি খুব ভাল, আর অনেক নদীতেই সোনা পাওয়া যায়… অনেক, অনেক মশলা, আর সোনা আর অন্যান্য ধাতুর প্রচুর খনি…

    কলম্বাস বললো, “এই ইন্ডিয়ানগুলি (মনে রাখতে হবে, কলম্বাসের ধারণা ছিল সে ইন্ডিয়াতে পৌছে গিয়েছে) খুব বোকা—তাদের কাছে কিছু চাইলে না করে না—সবার সাথে ভাগ করে দিতে চায়। আমাকে আরো জাহাজ আর সৈন্য দিন, আমি কাড়িকাড়ি সোনা আর ক্রীতদাস নিয়ে আসবো” রাজাও সোনার লোভে তাকে সতেরোটা জাহাজ আর ১২০০ লোক দিলেন। ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ থেকে দ্বীপে তারা আক্রমন করে মানুষদের বন্দী করে জাহাজে তুলতে লাগলো।

    সোনা না পেয়ে তারা পাচশো আরোয়াককে ধরে স্পেনে পাঠালো, যার দুইশ পথেই মারা গেল। এভাবে জাহাজের পর জাহাজ বোঝাই হয়ে স্বাধীন মানুষগুলি দাস হয়ে স্পেনে পাচার হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ক্রীতদাস পাঠিয়ে রাজাকে আর খুশি রাখা যাচ্ছিল না, কারন পথেই অনেক মারা যাচ্ছিল। তাই কলম্বাস ১৪ বছরের বেশি বয়সের সব আরোয়াকের উপর সমন জারি করলো, প্রতি তিন মাসে নির্দিষ্ট পরিমানের সোনা এনে দিতে হবে। সোনা দিলে তার বদলে একটা তামার পয়সা দেয়া হতো।

    যাদের কাছে সেই পয়সাটা পাওয়া যেত না, কলম্বাসের লোকেরা তাদের হাত কেটে ফেলতো, এবং তারপর রক্তক্ষরনে তারা মারা যেত।

    কিন্তু নদীতে সোনার পরিমান খুব অল্প ছিল—সেটা দিয়ে কলম্বাসকে খুশি করা যাচ্ছিল না, তাই আরোয়াকরা পালাতে লাগল, এবং স্প্যানিয়ার্ডরা তাদের কুকুর দিয়ে তাড়া করে মেরে ফেলল। আরোয়াকরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের বাশের বর্শা দিয়ে লোহার তলোয়ার, বন্দুক, আর ঘোড়ায় চড়া স্প্যানিয়ার্ডদের বিরুদ্ধে পারা অসম্ভব ছিল। নিজেদেরে ছোট বাচ্চাদের হত্যা করে আরোয়াকরা আত্মহত্মা করতে শুরু করল। মাত্র দুই বছরে খুন, আত্মহত্যা, অথবা হাত কাটার পরের রক্তক্ষরনে হেইতির আড়াই লক্ষ আরোয়াকের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মারা গেল।

    যখন কলম্বাসের সাঙ্গোপাঙ্গোরা দেখল, আর সোনা পাওয়া যাবে না, বাকি আরোয়াকদের ধরে তারা কৃষিকাজে দিন রাত খাটাতে লাগল। ১৫১৫র দিকে মাত্র ৫০ হাজার আরোয়াক বেঁচে থাকল, ১৫৫০ এ মাত্র ৫০০, আর ১৬৫০ এ দেখা গেল, একজন আরোয়াকও আর হেইতিতে বেঁচে নেই—একটা জনগোষ্ঠি সম্পুর্ন নিঃশ্চিন্ন করে দিল কলম্বাস এই জেনোসাইডে।

    এই তথ্যগুলি আমরা জেনেছি বার্তেলোম দে লাস কাসাস^ নামে এক পাদ্রীর ডায়রি এবং বই থেকে, যে প্রথমে অত্যাচারীদের একজন ছিল কিন্তু পরে স্পেনের এই আচরনের সমালোচক হয়ে যায়। লাস কাসাস লিখে গিয়েছেন, “স্প্যানিয়ার্ডদের অত্যাচার দিন দিন বাড়তে থাকে। তারা ইন্ডিয়ানদের পিঠে চড়া শুরু করে। ছুরির ধার পরীক্ষা করার জন্য তারা ইন্ডিয়ানদের শরীর কাটতেও দ্বিধা করতো না।“

    “পুরুষদের খনিতে চাবুক মেরে অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো, আর মহিলারা মাঠে কাজ করতো। তাদের দেখা হতো ৮-১০ মাস পরে পরে—তারা এতই দুর্বল থাকতো যে তাদের আর প্রজনন ক্ষমতা থাকতো না। বাচ্চা হলেও মায়ের বুকে কোন দুধ থাকতো না। লাস কাসাস দেখেছেন কিউবাতে মাত্র তিন মাসে ৭০০০ বাচ্চা মারা গিয়েছে অপুষ্টিতে। অনেক সময় মা রা নিজেই আর না পেরে বাচ্চাদের পানিতে ডুবিয়ে মেরেছে। পুরষরা মারা যাচ্ছিল খনিতে, মেয়েরা মাঠে, আর বাচ্চারা খেতে না পেরে। এভাবেই স্প্যানিয়ার্ডদের অত্যাচারে এই সুজলা-সুফলা জমি জনহীন হয়ে আসছিল। আমি নিজের চোখে এসব দেখেছি; এই অত্যাচারের কথা লিখতে গিয়ে আমার হাত কাপছে…”

    হিসপানিওয়ালা সম্পর্কে লাস কাসাস লিখেছেন, “আমি যখন ১৫০৮ সালে এখানে এসেছিলাম, ঐ দ্বীপে ৬০,০০০ মানুষ ছিল। তার মানে ১৪৯৪ (কলম্বাসের আগমন) থেকে ১৫০৮ পর্যন্ত ত্রিশ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ, দাসপ্রথা আর খনিতে কাজ করার সময় মারা গিয়েছে।“

    এই ছিল কলম্বাসের ইতিহাস। লাস কাসাস-এর সংখ্যাগুলি নিয়ে দ্বিমত আছে। আসলে কি ১৪৯৪-এ ত্রিশ লক্ষ লোক ছিল, নাকি আরো কম বা আরো বেশি? বর্তমান কিছু হিসাবে প্রায় ৮০ লক্ষ লোকের হিসাব পাওয়া যায়।

    এই রক্তাক্ত ইতিহাস স্কুলে পড়ানো হয় না। অ্যামেরিকার স্কুলের ইতিহাস বইয়ে কলম্বাস একজন হিরো, তাকে নিয়ে লেখা একটা কবিতা বাচ্চারা পড়ে, যেটার শেষ দুই লাইন হচ্ছে,
    The first American? No, not quite;
    But Columbus was brave, and he was bright.

    আরো দুইটা লাইন যোগ করে দেয়া উচিৎ এই কবিতায়:
    He killed millions and stole their gold
    That’s the real story, and that should be told.

    সুখবর হচ্ছে, অ্যামেরিকার অনেক শহরে আর কলম্বাস ডে উদযাপন করা হয় না, তার বদলে আদিবাসী দিবস (Indigenous Peoples Day) পালন করা শুরু হয়েছে।
    কপিঃ জাবেদ ইকবাল

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম