• শিরোনাম


    করোনা : কিছু ভুলের পর্যালোচনা -: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক | ২৯ মার্চ ২০২০ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ

    করোনা : কিছু ভুলের পর্যালোচনা -: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    কোভিড-১৯ এক বৈশ্বিক মহামারির রূপ ধারণ করেছে। সর্বত্রই শঙ্কা ও আতঙ্ক বিরাজমান। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াগুলো করোনা ভাইরাসের কিছু নেগেটিভ সাইট ফলাও করে প্রচারণা চালাচ্ছে। যদ্দরুণ আমাদের মুসলিম সমাজেও মারাত্মক কিছু ভুল কর্মপন্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তন্মধ্যে এখানে আমি শুধু তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব:
    এক. কতিপয় মুসলিম এমন আছে যারা মহামারী-ভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপারে বস্তুবাদীদের ধ্যান-ধারনা লালন করে। তাদের বিশ্বাস, ভাইরাস চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূত্র ধরে নিজ পাওয়ারে সংক্রমিত হয়। অথচ এটা ইসলাম সাপোর্ট করে না। ইসলাম রোগ সংক্রমণের ব্যাপারে তার অবস্থান সবিস্তার জানিয়েছে। হাদিসের ব্যাখ্যাতাগণ বলেছেন, শরীয়ত মহামারী সংক্রমণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেনা। কিন্তু তা সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাধীন। যেমন এক হাদীসে এসেছে, রাসূল সা. বলেন— “ খুজলিযুক্ত উটের মালিক যেন অন্যের সুস্থ উটের সাথে তার উট না রাখে।” -(সহীহ বুখারী: ৫৭৭১)। এর দ্বারা রোগ সংক্রমণ হওয়ার কথা বুঝে আসে। কিন্তু এটা যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রমিত হয়না, তা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা স্পষ্ট। রাসূল সা. বলেন— “ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই…।” এক বেদুইন জিজ্ঞেস করল: ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাহলে আমার উটের কী হলো, এগুলো সুস্থ অবস্থায় মাঠে চরছিল, এরপর খুজলিযুক্ত উট এসে এগুলোর মাঝে প্রবেশ করে, তারপর খুজলিযুক্ত উট সুস্থ উটগুলোকে খুজলিযুক্ত বানিয়ে দেয়? নবীজী বললেন, আচ্ছা, তাহলে প্রথম উটটি কীভাবে সংক্রমিত হলো? (অর্থাৎ প্রথম উট যেভাবে আল্লাহর হুকুমে খুজলিযুক্ত হয়েছে, বাকিগুলোও আল্লাহর ইচ্ছায়ই খুজলিযুক্ত হয়েছে)।”-(সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ৫৭১৭)। মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন, জাহেলী যুগে মক্কার কাফেররা মনে করতো, রোগ-ব্যাধি নিজস্ব ক্ষমতায় সংক্রমিত হতে পারে, আল্লাহ তাআলা রোগের মধ্যে এই ক্ষমতা দিয়ে অবসরে চলে গেছেন!(নাঊযুবিল্লাহ) তাই ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে গেলে নিশ্চিতভাবে সুস্থ ব্যক্তিও অসুস্থ হয়ে যাবে। ‘ছোঁয়াচে বলতে কোনো রোগ নেই বলে’ মূলত রাসূল সা. তাদের সেই ভ্রান্ত বিশ্বাস খণ্ডন করেছেন।।
    আপনি বলতে পারেন, তাহলে তো আর কোন সতর্কতার প্রয়োজন নেই! আল্লাহর উপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল করলেই হলো? আমি বলবো, না; এটা সম্পূর্ণ একতরফা চিন্তাধারনা। অসতর্ক হয়ে বসে থাকাকে তাওয়াক্কুল বলে না। রাসূলুল্লাহ সা. এক সাহাবীকে বলেছেন, ‘‘আগে উটকে রশি দিয়ে বাধ, তারপর তাওয়াক্কুল করো।’’ কোন ব্যাপারে আল্লাহর প্রতি ভরসা করার অর্থ এই নয় যে, সেক্ষেত্রে চেষ্টা-তদবীর পরিত্যাগ করতে হবে। বরং চেষ্টা অব্যাহত রেখে আল্লাহ পাকের রহমতের আশা রাখাই হলো তাওয়াক্কুল।।
    দুই. না বুঝে আমরা বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করছি। নিজেও অস্থির হয়ে যাই এবং অসুস্থ ও আক্রান্ত লোকদেরকে কোন সান্ত্বনাও দিই না। মুমিনের অসুস্থতাকেও গজব মনে করি। বড়ই পরিতাপের বিষয়, যারা আজন্মকাল ধরে বুযুর্গদের স্বপ্নের বিরোধিতা করে আসছে তাদেরই কথিত এক শাইখ করোনা সম্পর্কে এক স্বপ্নকে হাইলাইট করে ইসলামকে হাসির পাত্র বানিয়েছে। তাতে বলা হয়, করোনা এক গজব যা শুধু কাফেরদেরকেই আক্রান্ত করবে। অথচ এই মহামারীতে যে মুসলিমগণও এমনকি মক্কাভূমিও আক্রান্ত হচ্ছে, তা আজ অস্পষ্ট নয়। এছাড়া আরো বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরী করে করোনাক্রান্ত রোগীকে একপ্রকারের মনস্তাত্বিক চাপে ফেলা হচ্ছে। এসব শুনে রোগী হীনমন্য হয়ে পড়ে এবং তার মাঝে নৈরাশ্যভাব সৃষ্টি হয়। সে ভাবে, হায়! আমার উপর তাহলে আল্লাহর গজব এসে পড়ল! অথচ বালা-মুসিবত কাফেরদের জন্য গজব হরলও মুমিনদের জন্য তা নেয়ামতস্বরূপ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা যখন কোন সম্প্রদায়কে ভালবাসেন তখন তাদেরকে (রোগ-শোক ইত্যাদি দিয়ে) পরীক্ষা করেন। -(তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)। তিনি আরো বলেন, ‘‘কোন মুসলমানের রোগ ইত্যাদি কোন কষ্ট হলে এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা তার পাপরাশি ঝরিয়ে দেন যেমন বৃক্ষ তার পাতা ঝরিয়ে দেয়।’’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অন্যত্র এসেছে, ‘‘ঈমানদারের শরীরে একটি কাঁটা বিধঁলেও আল্লাহ তাআলা এর বদৌলতে তার গোনাহ মাফ করে দেন।’’-(সহীহ মুসলিম)। প্রাসঙ্গিকভাবে কারো প্রশ্ন হতে পারে যে, রোগ-ব্যাধিকে যদি নেয়ামত হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে তাহলে চিকিৎসা ও দুআর বিধান কেন দেয়া হয়েছে? এর উত্তর হলো, সুস্থ থাকাও একটি নেয়ামত আর এটিই দুর্বল বান্দার জন্য সহজ। এ দৃষ্টিভঙ্গিতেই সুস্থতার জন্য চিকিৎসা ও দুআ করতে হবে।।
    তিন. কয়েকদিন আগে ফেসবুকে দেখলাম, একজন করোনাক্রান্ত মৃত ব্যাক্তির দাফনের ছবি আপলোড করে লেখা হয়েছে: ‘‘আমি আবু জাহেল ও আবু লাহাবের দাফন দেখিনি; দেখেছি করোনাক্রান্ত লাশ দাফনের চিত্র।’’ কথাটি পড়ে আমি রীতিমত অবাক! সুস্থতা-অসুস্থতা দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। একজন মুমিনের লাশকে কাফেরের সঙ্গে তুলনা! ভাবতেও গা শিওরে ওঠে। করোনায় আক্রান্ত হওয়া এটাই কি তার দোষ? সাহাবা-তাবিঈনও তো ‘‘তাউন’’ নামক মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। ইতিহাস বলে, হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.ও হযরত মুআজ বিন জাবাল রা. সহ শত শত সাহাবী প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। মনে রাখতে হবে, মুমিন বান্দা রোগ-শোকে ভুগে মৃত্যুর তোহফা গ্রহণ করে জান্নাতের পথিক হয়। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘‘মুমিন বান্দা (মৃত্যুর দ্বারা) দুনিয়ার কষ্ট-ক্লেশ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে উপনিত হয়।’’ -(সহীহ বুখারী)। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমীন।।
    লেখক:
    প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক: শাহবাজপুর, বি-বাড়িয়া, বাংলাদেশ।।

    Facebook Comments



    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম