• শিরোনাম


    ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর যোগ্য উত্তরসূরি পুত্র আলী আকবর খাঁ ও কন্যা অন্নপুর্না [] প্রফেসর ফরহাদ হোসেন

    | ০৩ জুন ২০২১ | ২:৫৮ অপরাহ্ণ

    ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর যোগ্য উত্তরসূরি পুত্র আলী আকবর খাঁ ও কন্যা অন্নপুর্না [] প্রফেসর ফরহাদ হোসেন

    সংগীত ভুবনের মুকুট বিহীন সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জীবন ও বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের আদ্যোপান্ত নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কলম ধরেছেন ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক প্রফেসর ফরহাদ হোসেন। ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে লেখকের এ লেখা। আজ পাঠকের উদ্দেশে থাকছে ৪র্থ পর্ব।

    ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁনের সংগে যথারীতি আমাদের খাঁ সাহেব রামপুরে পৌঁছে নিয়মিত তালিম গ্রহন শুরু করলেন। শিল্পীরা সাধারণত বিশেষ মেজাজের মানুষ। অনেক গুনী শিল্পী সম্পর্কে শুনেছি ব‍্যক্তিগত জীবনে বেশ মেজাজী ছিলেন। আহমেদ আলী খান স্নেহবৎসল হলেও কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবও অত‍্যন্ত মেজাজি ছিলেন। সন্তান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর ভালবাসার কোন কমতি ছিল না। কিন্তু বাঘা বাঘা ছাত্ররা ও চোখের উপর চোখ রেখে ওস্তাদজির সংগে কথা বলতে পারতেন না, সেই রবিশংকর থেকে শুরু করে নিখিল ব‍্যানার্জি, তিমির বরণ, ইন্দ্রনীল, সরনরানী কেউ না। তাঁর একমাত্র পুত্র জগৎ বিখ‍্যাত সরোদ বাদক ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেব ও কোনদিন পিতার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারতেন না। ভারতীয় একটি টিভি চ‍্যানেল কে দেয়া ইংরেজি সাক্ষাৎকারে পিতা সম্পর্কে স্নৃতিচারণ করতে গিয়ে আলী আকবর খাঁ সাহেব তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে পিতা তাঁকে খুব ভাল বাসতেন কিন্তু সেই স্নেহের প্রকাশ ছিল খুব ক্ষীন। মেয়ে অন্নপুর্না (রওশনারা) কে পিতা আলাউদ্দিন ভীষন স্নেহ করতেন এবং মেয়ের সংগীত শিক্ষার সক্ষমতার উপর খাঁ সাহেবের উচ্চ ধারনা ছিল। কিন্তু মেয়ের প্রতি স্নেহ প্রকাশের ক্ষেত্রেও ওস্তাদজি যতেষ্ট পরিমিতি বোধ বজায় রাখতেন। মেয়ে অন্নপুর্নাকে সংগীত শেখানোর প্রাথমিক পরিকল্পনা খাঁ সাহেবের ছিল না। পুত্র আলী আকবরকেই তিনি তালিম দিতে শুরু করেন। কিন্তু একদিনের একটি ঘটনা খাঁ সাহেবকে খুব নাড়া দেয় এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে মেয়েকেও তিনি সংগীত শেখাবেন। ঘটনাটি এখানে উল্লেখের দাবী রাখে বলে আমি মনে করি। খাঁ সাহেব পুত্র আলী আকবর খাঁ কে সরোদে প্রতিদিন একটি করে রাগের পাঠ দেন। কোন কোন দিন Lesson দিয়ে ওস্তাদজি বাইরে যেতেন। বলে যেতেন রাগের পাঠ যেন complete করে রাখে, তিনি এসে দেখবেন কতটুকু শুদ্ধ ভাবে অনুশীলন করা হলো। আলী আকবর খাঁর একটি অভ‍্যাস ছিল শিখতে গিয়ে তিনি পিতার বেঁধে দেয়া বিষয়ের বাইরে নিজে কিছু সংযোজন করতেন এবং অনেক সময় সরোদে রাগের আলাপ তোলায় ভুল করতেন যা খাঁ সাহেব পছন্দ করতেন না। ফিরে এসে পুত্রের এই বাড়তি কারসাজি ও ভুলের জন্যে ওস্তাদজি আলী আকবর খাঁকে বকাঝকা করতেন। ছোট বোন অন্নপুর্না দূরে দাড়িয়ে পুত্রকে দেয়া পিতার তালিম মনোযোগের সাথে লক্ষ‍্য করতেন এবং শুনতেন। একদিন আলী আকবর পিতার দেয়া রাগের একটি পাঠ সরোদে তুলতে গিয়ে বার বার ভুল করছিলেন। অন্নপুর্না কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তা লক্ষ‍্য করছিলেন। হঠাৎ বড় ভাইকে বলে ফেললেন” দাদা আজ নির্ঘাত তুই বাবার বকা খাবি।” আলী আকবর একটু অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে বললেন,” কেন?” তুই তো ভুল বাজাচ্ছিস!” অন্নপুর্নার নির্লিপ্ত উত্তর।” তুই তো শিখছিস না, বুঝলি কেমন করে?” আলী আকবর খাঁর অবাক প্রশ্ন। “বাবা যখন তোকে শেখায়, আমি তখন দূর থেকে দেখি। তুই ও বাবা যখন বাড়িতে থাকিস না তখন আমি নিজে নিজে বাজাই। সরোদটা আমাকে দে, আমি তোকে দেখিয়ে দিচ্ছি।” আলী আকবর অবিশ্বাসের চোখে বোনের দিকে সরোদটা এগিয়ে দিলেন। অন্নপূর্নার সরোদ ধরার দক্ষ কৌশল দেখে বড়ভাই আলী আকবর রীতমত অবাক। তিনি কৌতুহল দমন করতে না পেরে বাবা আসার সাথে সাথে অন্নপুর্নার সরোদ বাদনের দক্ষতার কথা জানিয়ে দেন। বিবরণ শুনে খাঁ সাহেব গম্ভীর হয়ে গেলেন। তিনি তো মেয়েকে শেখাননি। তাহলে কী করে তা সম্ভব।
    তাৎক্ষণিকভাবে ওস্তাদজি মেয়েকে কিছু বললেন না। দুপুরের খাবারের পর তিনি মেয়েক কাছে ডাকলেন।



    খাঁ সাহেবের ডাকে মেয়ে অন্নপুর্না দুরু দুরু বক্ষে পিতার সামনে হাজির হলেন। কিন্তু পিতার শাসনের মেজাজ না দেখে অন্নপুর্না অবাক এবং কিছুটা স্বস্থি বোধ করলেন। খাঁ সাহেব নিজের সরোদটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে স্নেহমাখা কন্ঠে বললেন” দাদাকে( আলী আকবর খাঁ)
    “যা বাজিয়ে শুনিয়েছো আমাকে একটু শুনাও তো।” বাবার খুশ মেজাজ দেখে মেয়ে নির্ভয়ে ভক্তিভরে পিতার সরোদ হাতে নিলেন। মেয়ের সরোদ ধরার কৌশল ও পক্কতা দেখে খাঁ সাহেবের বুঝার বাকি রইল না যে মেয়ে তাঁর অগোচরে সরোদ নামক বাদ‍্যযন্ত্রের উপর ভালই অনুশীলন করেছে। তিনি আরও প্রীত হলেন অন্নপুর্নার আসাধারন বাধন শৈলী দেখে কিন্তু অবাক হলেন না। বরং তাঁর অতীত জীবনের এক স্মৃতি তাঁকে আচ্ছন্ন করলো।
    খাঁ সাহেব তখন রামপুরের ওস্তাদ আহমেদ আলী খানের কাছে তালিম নিচ্ছেন। তালিমের বিষয় Indian Classical Music এর বিভিন্ন রাগ রাগিনী। আহমেদ আলী মন প্রান ঢেলে দিয়ে শিষ‍্য আলাউদ্দিনকে শেখাচ্ছিলেন। শিক্ষার্থী হিসেবে ইতিমধ্যেই আলাউদ্দিন নিজের সক্ষমতা তাঁর সংগীত গুরুর সামনে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। কিন্তু একটি বিষয় শিষ‍্য আলাউদ্দিনকে অবাক করেছিল। আলাউদ্দিন গভীর রাতে প্রায়ই তাঁর শয়নকক্ষ থেকে আহমেদ আলী খানকে সরোদে বিশেষ কিছু রাগ যে গুলোকে বন্দিশ বলা যেতে পারে বাজাতে শুনতেন। কিন্তু সংগীতের এই বিশেষ বিষয়গুলো আহমেদ আলী খান শিষ‍্য আলাউদ্দিনকে শেখাতেন না।সংগীতের ব‍্যাপারে আমাদের খাঁ সাহেব বরাবরাই খুব অনুসন্ধিৎসু ছিলেন।
    গ্রীক পুরাণের ভাষায় আলাউদ্দিন খাঁকে বলা যায় সংগীত দেবীর বরপুত্র। সংগীত শেখার ক্ষত্রে তিনি ছিলেন Yeo-man নাছোড়বান্দা। আহমেদ আলী খান ভীষণ মেজাজী সংগীতগুরু সেটা জানা সত্বেও খাঁ সাহেব কৌতুহল দমন করতে পারেলন না। বিনীত ভাবে তিনি গুরুকে বিশেষ রাগগুলো শিখানোর প্রর্থনা জানান। প্রথমে ওস্তাদ আহমেদ আলী আলাউদ্দিনের প্রার্থনা এড়িয়ে যান। কিন্তু বারংবার শিষ‍্যের প্রর্থনায় তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিলেন শিষ‍‍্যের এই প্রার্থনা মন্জুর করা সম্ভব নয়। কারন হিসেবে বললেন যে প্রত‍্যেক ঘরানার কিছু চিজ্ (things) থাকে যা রক্ত সম্পর্কের বাইরে কাউকে শেখানো হয় না।আলাউদ্দিন গুরুর উত্তরে দুঃখ পেলেও হতাশ হলেন না। তিনি তাঁর স্বভাবজাত হিমালয়সম আগ্রহ নিয়ে সংগীতের এই বিশেষ রাগ রাগিনী আয়ত্ব করার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। প্রথমে খাঁ সাহেব টানা রাত জাগা শুরু করলেন। কারন আহমেদ আলী খান সব রাতে সংগীতের এই বিশেষ রাগ বাজাতেন না। খাঁ সাহেব প্রথমে শুনে শুনে এই রাগ গুলো আয়ত্ব করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অচিরেই তিনি বুঝতে পারলেন শুধু শুনে শুনে এই কলা আয়ত্বে আনা দুরহ ব‍্যাপার।তাই তিনি কৌশল পরিবর্তন করলেন।
    খাঁ সাহেব তাঁর গুরু আহমেদ আলী খানের শয়ন কক্ষের দরজায় বা জানালায় কোন ছিদ্রের সন্ধান করছিলেন। কথায় আছে ইচ্ছা থাকলে উপায় মিলে। খাঁ সাহেবের ব‍্যপারে তাই ঘটল। তিনি আহমেদ আলী খানের শয়ন কক্ষের দরজায় কবজা বরাবর ছিদ্র বা ফাঁক খুঁজে পেলেন। অপেক্ষাকৃত ভালো ভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপের জন‍্য তিনি গুরুর অগোচরে ধারালো কিছুর সাহায়‍্যে দরজার ফাঁকাটিকে আরও বড় করে নিলেন।যেদিনই আহমেদ আলী খান তাঁর বিশেষ রাগ গুলো বাজাতেন, ছোট খাঁ সাহেব উনার মত কাজ চালিয়ে যেতেন আর্থাৎ দরজার ফাঁক দিয়ে তাঁর শাণিত চোখ সরোদের উপর অবিরাম গতিতে গুরুর আঙ্গুল সঞ্চালনের উপর নিক্ষেপ করতেন। শুরু হল খাঁ সাহেবের ভিন্ন পন্থায় শিক্ষা গ্রহন। একদিন আহমেদ আলী খান স্ত্রীসহ মেয়ের বাড়িতে মেয়েকে দেখতে রওয়ানা হলেন। বাড়ির রক্ষনা বেক্ষন শিষ‍্য আলাউদ্দিনের উপর রেখে গেলেন। ছোট খাঁ সাহেব ভাবলেন এইতো সুযোগ। রাত জেগে গুরুর সরোদে আঙ্গুল সঞ্চালন থেকে যা শিখলেন গুরু যতদিন মেয়ের বাড়িতে থাকবেন, মনের আনন্দে তা অনুশীলন করবেন।ছোট খাঁ সাহেবের আর তর সইছিল না। আহমেদ আলী খান বাড়ি থেকে কয়েক ক্রোস অতিক্রম করার পরই আলাউদ্দিন সরোদ হাতে নিলেন।সংগীতের বরপুত্র সরোদের তারের উপর আঙ্গুলের ঝড় তুললেন।
    এদিকে পথে আহমেদ আলী খান বেশ অসুস্থ বোধ করায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। বাড়ির বাহির আঙ্গিনায় পোঁছতেই যা কানে আসল তা হল শিষ‍্য আলাউদ্দিনের বাজানো সেই রাগ যা তিনি আলাউদ্দিনকে শেখাননি রেখে দিয়েছেন খুন কা রিস্তা’র কাউকে শেখানোর জন‍্যে।

    লেখক: বিভাগীয় প্রধান,ইংরেজি বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম