• শিরোনাম


    একজন সতী নারী [] মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া

    মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া, অতিথি লেখক - মজলিশপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। | ১৩ মে ২০২০ | ৭:১২ অপরাহ্ণ

    একজন সতী নারী  [] মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া

    বর্ণিত যে, বনি ইসরাঈলের একজন ব্যবসায়ী হজ্বে যাওয়ার সময় তার স্ত্রীকে ছোট ভাইয়ের ঘরে রেখে যায়। ছোট ভাই ক’দিন পর (তার ভাবী) মহিলাকে তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। মহিলা তার প্রস্তাবে অসম্মতি জানায়। সে অনেক অনুনয় ও জবরদস্তী করেও মহিলাকে অপকর্মে রাজী করাতে পারেনি।
    এ দিকে শয়তানও সব সময় ছোট ভাইকে কুমন্ত্রণা দিয়েই যাচ্ছে। একদিন শয়তান মানুষ বেশে সেই লোকটির কাছে এসে তাকে এভাবে প্ররোচিত করে যে, যদি মহিলা তার মনের চাহিদা মেটাতে রাজি না হয় তবে তার উপর যিনার অপবাদ আরোপ করবে এবং প্রস্তরাঘাত করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার হমকী প্রদান করবেন।
    শয়তানের প্ররোচনায় সে পুনরায় মহিলার নিকট কুকর্মের প্রস্তাব দেয়। এবং তার প্রস্তাবে রাজি না হলে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হবে, সে কথাও তাকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও মহিলা রাজী হলো না।
    সুতরাং পাষণ্ড লোকটি মহিলার উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে এবং পাথর মেরে হত্যা করার জন্যে লোকদের নির্দেশ দেয়। লোকেরা মহিলাকে নিয়ে দূরে এক জঙ্গলে প্রস্তরাঘাত করে এবং মহিলার মৃত্যু নিশ্চিত মনে করে জঙ্গলের এক পাশে ফেলে চলে আসে। কিছুক্ষণ পর একজন পথিক জঙ্গলের পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিল। সে জঙ্গল থেকে মানুষের কান্নার শব্দ শুনে নিকটে গিয়ে একজন মহিলার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখে শিহরিত হয়ে উঠে। তখন সে হাত-পা খুলে দিয়ে মহিলাটিকে তার গৃহে নিয়ে আসে।
    ঐ রাতে লোকটির ঘরে একজন মেহমানের আগমন হয়। মেহমান ঐ বিপদগ্রস্ত সুন্দরী মহিলাটিকে দেখামাত্রই তার উপর আসক্ত হয়ে পড়ে। রাতে বিপদ গ্রস্ত মহিলার পার্শে বাড়ীওয়ালার এক সুন্দরী যুবতী মেয়ে তাঁর সাথে ঘুমায়। এদিকে রাত যখন গভীর হয় এবং আশে পাশের লোকেরা গভীর নিদ্রায় বিভোর তখন লোলুপ্যমনা চরিত্রহীন মেহমান বিপদ গ্রস্ত মহিলার ঘরে প্রবেশ করে তার চরিতার্থ করার জন্য।
    ভুলক্রমে ঐ মহিলার পরিবর্তে গৃহস্বামীর যুবতী কন্যার উপর অপকর্মের জন্যে চড়াও হয়। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও যখন তাকে কুকর্মে রাজী করাতে পারেনি, তখন উভয়ের মধ্যে দস্তাদস্তির এক পর্যায়ে মেহমান কন্যাটিকে চিনতে পারে। তখন সে গৃহস্বামীর যুবতী কন্যাকে হত্যা করে প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে পালিয়ে গেল। গৃহস্বামী তার কন্যাকে মৃত অবস্থায় দেখে সে ও তার স্ত্রী মনে করল যে, এ জঘন্যতম হত্যাকন্ডটি ঐ বিপদগ্রস্ত মহিলাই ঘটিয়েছে। বিবেকের অবচেতনায় প্রলুব্ধ হয়ে গৃহস্বামী ও তার স্ত্রী বিপদগ্রস্ত মহিলার উপর ক্রোধান্বিত হয়ে মহিলাটিকে মারপিট করে গৃহ থেকে বের করে দেয়। মহিলাটি ঘর থেকে বের হয়ে এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।

    সে বিষন্ন মনে পায়ে হেটে চলছিল। নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মনে মনে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছিল। কিছু পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ সে দেখলো যে, জনৈক লোককে তার ঋণের টাকা পরিশোধ করতে অপারগ হওয়ায় মালিক তাকে গুলিবিদ্ধ করতে প্রস্তুত। মহিলা লোকটির অসহায়ত্ব দেখে ঋণের টাকা শোধ করে তাকে মালিক থেকে মুক্ত করে দেয়। এতে লোকটি মহিলার নিকট অতিশয় কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে এবং তার বিনিময় হিসেবে সে মহিলার নিকট গোলাম হয়ে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। মহিলাও তাতে রাজী হয়ে গেল।



    অত:পর মহিলা লোকটিকে সাথে নিয়ে চলল। পথিমধ্যে সমুদ্র পথে যাবার সময় জাহাজের একটি কক্ষে উভয়ই অবস্থান করে। হঠাৎ লোকটি কক্ষের মধ্যে লাবণ্যময় চেহারা দেখে ফেলে। অপরুপ চেহারাখানি দেখে গোলাম মহিলার উপর আসক্ত হয়ে পড়ে এবং মহিলাকে কুকর্মে লিপ্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু মহিলা কিছুতেই তার প্রস্তাবে রাজী হয়নি। ঐ জাহাজে পাশের একটি কক্ষে অপর একজন বণিক সফরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল । গোলামটি মহিলাকে রাজী করাতে না পেরে ক্ষোভে জ্বলে উঠে এবং চক্রান্ত করে লোকটিকে বলে যে, তার নিকট একজন অতুলনীয় সুন্দরী দাসী আছে।
    সে ঐ দাসীকে বিক্রি করবে। বণিক লোকটি মহিলার রূপ লাবণ্য দেখামাত্রই তার উপর আসক্ত হয়ে তাকে খরিদ করে নেয় এবং তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য মহিলাকে বাধ্য করে। মহিলা অনেক অনুনয় বিনয় করে বলে যে সে বাদী নয়। বরং সে লোকটি তাকে বাদী বলে বিক্রি করেছে সেই আমার কৃতদাস। আমি তাঁর ঋণের পয়সা শোধ করে তাকে গুলির সাজা থেকে মুক্ত করে এ পর্যন্ত এনেছি।
    লোকটি মহিলার কথায় কর্ণপাত না করে নিজের আখাংকা পুর্ণ করার জন্যে মহিলার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এমন সময় সমুদ্র থেকে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় উঠে এবং জাহাজ সমুদ্রে ডুবে যায়। ঘটনাক্রমে মহিলাটি একটি কাঠের উপর বসে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হল এবং সম্পুর্ণ সুস্হাবস্হায় সমুদ্রের পাড়ে অন্য একটি শহরে গিয়ে উঠল। এ দুর্ঘটনায় বহু লোক মারা যায়, কিন্তু জাহাজের ঐ বণিক লোকটিও বেঁচে গেল।
    মহিলাটি শহরে গিয়ে জানতে পারে যে, ঐ দেশের রাজা অত্যন্ত সৎ লোক ও খোদাভীরু। মহিলাটি তখন রাজার নিকট উপস্থিত হয়ে তার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সকল বিপদের কথা বর্ণনা করলেন। বাদশাহ মহিলার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনেন এবং তাকে অতিশয় নেক্কার মনে করে শহরের উপকণ্ঠে তার ইবাদতের জন্যে আলাদা একটি ঘর তৈরী করে দেন। মহিলা ঐ গৃহে অতি নির্জনে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে নিয়োজিত রইলো।

    কিছুদিন পর হাজ্বী সাহেবের ভাইয়ের চোখ দু’টি অন্ধ হয়ে যায় এবং যারা মহিলার উপর ব্যভিচারের মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিল তারাও দৃষ্টিহীন হয়ে যায়। এ দিকে হাজ্বী সাহেব পার্শবর্তী দেশে জনৈক মহিলার দরবেশী ও দোআ কবুল হওয়ার সংবাদ জানতে পারে। সুতরাং কাল বিলম্ব না করে তার ভাইকে সহ সকল অন্ধ লোকদের সাথে নিয়ে ঐ দরবেশ মহিলার নিকট যাওয়ার জন্য যাত্রা করে।
    পথে যে লোকটি গৃহস্বামীর যুবতী কন্যাকে ঐ সুন্দরী মহিলা মনে করে রাতের অন্ধকারে হত্যা করেছিল তার সাথে দেখা হয়। সে অধহ রোগে মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল। সেও দুআ নেয়ার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুতরাং হাজ্বী সাহেব তাকেও সাথে নিয়ে নেয়। আর কিছু দূর যাওয়ার পর দেখা গেল- যে লোকটিকে ঋণ শোধ করে মৃত্যুর হাত হতে বাঁচিয়ে ছিল, সে ক্ষয় রোগ বা ক্যানসার রোগে ভুগছে। সেও মহিলার নিকট রোগ মুক্তির জন্য যাওয়ার অপেক্ষা করছিল। হাজ্বী সাহেব তাকেও সাথে নিল। সমুদ্র পার হয়ে হাজ্বী সাহেবের সাথে একজন পঙ্গু লোকের সাক্ষাত হলো, সেও দুআর জন্যে মহিলার নিকট যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহন করছিল। হাজ্বী সাহেব তাকেও সাথে নিয়ে তার গন্তব্যে পৌছে গেল।

    মহিলা সেই রোগাক্রান্ত লোকদেরকে দেখে চিনে ফেললো এবং বললো, যদি তোমরা নিজ নিজ অপরাধের কথা আমার সামনে স্বীকার কর তবে তোমাদের রোগ মুক্তির জন্য দুআ করব। নতুবা দুআ করব না। মহিলার এ প্রস্তাবে তারা অসম্মতি জানায়। কিন্তু মহিলাও দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেয় যে, যতক্ষণ তারা অপরাধ স্বীকার না করবে, ততক্ষণ দুআও করা হবে না। কাজেই তারা নিরুপায় হয়ে জনৈকা মহিলার সাথে কৃত অপরাধের কথা স্বীকার করলো। এ দিকে মহিলা তার স্বামী হাজী সাহেবকেও দেখামাত্রই চিনতে পারলো।
    সুতরাং সে পর্দার আড়ালে থেকে বের হয়ে তার স্বামীর সাথে সাক্ষাত করলো, এবং তার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সকল লোমহর্ষক ঘটনাগুলো একের পর এক বলল। সাথে সাথে এ কথাও জানিয়ে দিল যে, ঐ রোগাক্রান্ত লোকেরাই তার শ্লীলতাহানীর অপচেষ্টা করেছিল। যা হোক মহিলা লোকদেরকে বললো, তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃত অপরাধের জন্যে তওবা কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও। আল্লাহ তোমাদের হয়তো ক্ষমা করে দেবেন। আর আমার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে মাফ করে দিলাম। এ কথা বলে মহিলা তাদের জন্যে দুআ করলেন। তারা তখন রোগ থেকে মুক্তি পেল এবং অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে মহিলার নিকট ক্ষমা চাইল। মহিলা তাদের ক্ষমা করে দিলেন।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম