• শিরোনাম


    ইমাম তাঁকে বানাও, যার বউ সুন্দরী! -রশীদ জামীল

    | ১৭ অক্টোবর ২০১৮ | ৩:৫১ পূর্বাহ্ণ

    ইমাম তাঁকে বানাও, যার বউ সুন্দরী!    -রশীদ জামীল

    আদ দুররুল মুখতারে বর্ণিত একটি মাসআলা নিয়ে লা-মাজহাবিরা এতো নির্লজ্জভাবে চিল্লাফাল্লা করে যে, তাদের বলতে শরম না লাগলেও মানুষের শুনতে শরম লাগে। তারা বলে, ‘হানাফিরা তাদের কিতাবে ‘যার বউ বেশি সুন্দর, ইমামতির জন্য সে বেশি যোগ্য। যার মাথা মোটা এবং পুরুষাঙ্গ ছোট, সে ইমামতির জন্য আরও বেশি যোগ্য। কতো নোংরা হানাফিদের মানষিকতা’।

    বাংলাদেশি পাঠকরা যদি ভাবেন, এমন কোনো অভিযোগ তো আমরা আহলে হাদিসের কোনও শায়খের মুখে এখনো শোনলাম না, তাহলে বলি, বাংলাদেশে শায়খদের দুই/একজন ছাড়া বাকিরা যেখানে যের যবর পেশ দেওয়া থাকার পরও কুরআনে কারিম শুদ্ধভাবে তেলাওয়াতই করতে পারে না, যাদের বেশিরভাগের তেলাওয়াতই ক্বারী আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফময়, সেখানে আদ দুররুল মুখতারের মতো (যের-যবর-পেশহীন) কিতাব তারা রিডিংই-তো পড়তে পারবে না, অভিযোগ করা তো পরের কথা! (রিডিংকে বাংলায় পড়া বলে, কথাটি মাথায় আছে।)



    ইউরোপ-আমেরিকা এবং ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের আহলে হাদিস আলেমদের আকিদা যাই থাকুক; তাদের ইলিম আছে স্বীকার করা লাগে। এরা আমাদের কিতাবাদি থেকে সাধারণ পাবলিককে সহজে বিভ্রান্ত করা যায়; এমন কিছু কন্ট্রাড্রিকটরি কথা খুঁজে বের করে এবং পাবলিকলি প্রচার করে বেড়ায়। সুতরাং এখন পাবলিক প্লেসেই জবাব থাকার সময়।

    ‼️‼️

    কী বলা হয়েছে দুররুল মুখতারে?
    .
    কোথাও একাধিক ব্যক্তি উপস্থিত এবং সবাই ইমামতির যোগ্যতা রাখেন। এখন কাকে ইমাম বানানো যায়। হানাফি মাজহাবের মৌলিক প্রাধান্য-নীতির আলোকে দুররুল মুখতারে বলা হয়েছে,
    وألاحق بالإمامة الأعلم بأحكام الصلوة ثم الاحسن تلاوة ثم الاورع
    ثم الاسن ثم الاحسن خلقا ثم الاحسن وجها ثم الاحسن زوجة
    ثم الانزح ثوبا ثم الأكبر رأسا والأصغر عضوا
    ইমামতির জন্য প্রথম হকদার হলেন যিনি নামাজের মাসাঈল বেশি জানেন। তারপর যার তেলাওয়াত বেশি শুদ্ধ। তারপর যে বেশি নেককার। তারপর যিনি বয়সে সিনিয়র। তারপর যার স্বভাব সুন্দর। তারপর যার চেহারা সুন্দর। তারপর যার স্ত্রী সুন্দর। তারপর যার পোশাক সুন্দর। তারপর যার মাথা অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় বড়।
    (রাদ্দুল মুহতার, ২/২৯৬)

    ‼️‼️
    প্রথম অভিযোগ
    .
    ‘যার স্ত্রী বেশি সুন্দর, ইমামতির জন্য তিনি বেশি যোগ্য’। এখন তো তাহলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইমামের বউয়ের মুখ থেকে ঘোমটা সরাতে হবে। চেক করতে হবে কার বউ দেখতে কেমন! কার গালে টোল পড়ে! কার থুতনিতে তিল আছে। কেমন মাজহাবরে বাবা…’!

    আহাফিদের এই অভিযোগের জবাব দেওয়ার আগে দেখা যাক ইমামতির জন্য কোনো প্রধান্য-নীতির ভিত্তি শরিয়তে আছে কি না!

    সহিহ বোখারিতে হজরত মালিক বিন হুয়াইরিস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবীয়ে কারিম আলাইহিত-তাহিয়্যাতু ওয়াত-তাসলিম বলেন,
    وإذا حضرت الصلاة فليؤذن لكم أحدكم وليؤمكم أكبركم
    যখন নামাজের ওয়াক্ত আসবে, তখন একজন আজান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বয়সে বড়, তাকে ইমামতিতে দেবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নাম্বার ৬৫৩)। এখানে ইমামতির জন্য কে বেশি হকদার, এক কারণ নবীজি বলে দিলেন।
    .
    হজরত আবু মাসউদ আনসারি রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; নবীজি বলেছেন,
    يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءً فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءً فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا وفي رواية فَأَكْبَرُهُمْ سِنًّا …
    ‘ইমাম হবেন তিনি, যার তেলাওয়াত বেশি শুদ্ধ। সবার তেলাওয়াত যদি শুদ্ধির ক্ষেত্রে সমান হয়, তাহলে দেখা হবে কে সুন্নাতের বেশি পাবন্দ। যদি এতেও সবাই সমান হন, তাহলে দেখা হবে কে আগে হিজরতকারী। হিজরতেও যদি সমান হন, তখন দেখা হবে কে আগে মুসলমান হয়েছেন অথবা বয়সে কে বড়।’ (সহিই মুসলিম, হাদিস নাম্বার ২৩৭৩)
    .
    -মারিফাতুস সাহাবা লি-আবি নুয়াইম-এর বর্ণনা; নবীজি বলেছেন,
    ليؤمكم أقرؤكم لكتاب الله فإن كانت القراءة واحدة فليؤمكم أعلمكم بالسنة فإن كانت السنة واحدة فليؤمكم أقدمكم سنا
    ইমাম তাঁর হওয়া উচিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচে বিশুদ্ধ তেলাওয়াত করতে পারে। যদি একাধিক বা উভয়ের ক্বিরাআতই বিশুদ্ধতার মানদণ্ডেসমান হয়, তখন দেখবে কার মধ্যে সুন্নাতের পাবন্দি বেশি। এতেও যদি সমান হন, তখন দেখবে কে বয়সে সিনিয়ার। (মারিফাতুস সাহাবা লি-আবি নুয়াইম, ৪৮১৮)
    .
    তাহলে দেখা গেল নবীজি স্বয়ং ইমামতির জন্য কিছু প্রধান্য-নীতি বলে দিয়েছেন। ফুক্বাহায়ে কেরাম এর উপর কিয়াস করে আরও কিছু কারণ যোগ করেছেন। এটাই ফুক্বাহার কাজ। এটাও শরিয়তের অংশ। কারণ, কিয়াসে শরঈও দলিলে শরিয়ত।
    এবার চলুন দেখা যাক দুররুল মুখতারে যে বলা হয়েছে… ‘তারপর তাকে ইমাম বানাও, যার বউ সুন্দর’, এই কথার কি কোনো ভিত্তি আছে হাদিসে? নাকি রোমান্টিক মোড থেকেই কথাটি বলে ফেলা হয়েছে। ভিত্তি যদি না থাকে, তাহলে এটা তিনি বলতে পারেন না। শরিয়ত মোড বানানোর জায়গা না। আর যদি ভিত্তি থাকে, তাহলে অভিযোগকারীদের একটা কথাই শুধু বলবার থাকে, অফ যা বাবা।

    ‼️‼️
    আল মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইনে বর্ণিত। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
    إِنَّ سَرَّكُمْ أَنْ تُقْبَلَ صَلاتُكُمْ فَلْيَؤُمَّكُمْ خِيَارُكُمْ ،
    فَإِنَّهُمْ وَفْدُكُمْ فِيمَا بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ رَبِّكُمْ عَزَّ وَجَلّ
    ‘তোমরা যদি চাও তোমাদের নামাজ কবুল হোক, তাহলে তোমাদের মধ্যে যে সবচে ভালো মানুষ (খিয়ার), তাকে ইমাম বানাও। কারণ, ইমাম তোমাদের এবং তোমাদের আল্লাহর মধ্যে মিডলম্যানের ভূমিকা পালন করেন।’ (আল মুসতাদাক আলাস সাহিহাইন, হাদিস নাম্বার ৭৪০২)
    .
    খিয়ার মানে কী?
    খিয়ার কাকে বলে?
    .
    এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে। নবীজি বলেছেন,
    خياركم خياركم لنساءهم
    তোমাদের মধ্যে সে-ই খিয়ার (ভালো মানুষ), যে তার বউয়ের কাছে খিয়ার বা ভালো মানুষ। ( তিরমিজি, হাদিস নাম্বার ১১৬২)
    .
    বউয়ের কাছে কে বেশি ভালো হয়, কীভাবে ভালো হয়, ব্যাখ্যা করা হয়েছে শামিতে। (শামি ২/২৯৫) বলা হয়েছে,
    قوله ثم الأحسن زوجة ) لأنه غالبا يكون أحب لها وأعف لعدم تعلقه بغيرها، وهذا مما يعلم بين الأصحاب أو الأرحام أو الجيران ، إذ ليس المراد أن يذكر كل منهم أوصاف زوجته حتى يعلم من هو أحسن زوجة
    .
    মানে কী কথাগুলোর?
    সহজ করে বলি। একজন লোক তার স্ত্রীর কাছে তখনই ভালো হবে, যখন স্ত্রীকে বেশি ভালবাসবে। বেশি পছন্দ করবে। মানুষ প্রাকৃতিক প্রাণী। সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ স্বভাবজাত। আর এটা দোষেরও কিছু নয়। ‘আল্লাহু জামিলুন, য়্যুহিব্বুল জামাল’। আল্লাহ সুন্দর, আল্লাহ সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। কারও স্ত্রী যদি সুন্দরী হয়, তাহলে তার প্রতি স্বামীর টান বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। সঙ্গতকারণেই পরনারীর প্রতি কোনো আকর্ষণ আর থাকবে না। আর এটাই বলা হয়েছে শামিতে, ‘আহসানু জাওযাতান’। এখানে অবাক হওয়ার কারণ ছিল না।

    প্রশ্ন তবুও থেকে যায়।
    কীভাবে বোঝা যাবে কার বউ বেশি সুন্দর!

    আল্লামা শামি বলেন,
    مما يعلم بين الأصحاب أو الأرحام أو الجيران
    এটা এমন কোনো ব্যাপার না। এসব ব্যাপার আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশির কাছে গোপন থাকে না। কার স্ত্রী দেখতে কেমন, এটা মেয়ে মহল থেকে পুরুষ মহলে চলে আসে।

    আসলে কোনো কথার গভীরে যেতে পারলে অর্থ হয় এক, উপরে উপরে দেখলে অর্থ দাঁড়ায় আরেক। কেউ কাউকে বললো, ‘বেটা বাঘের বাচ্চা।’ কথাটির দৃশ্যমান অর্থ হলো ‘জানোয়ারের বাচ্চা’। কিন্তু আসলেই কি ‘জানোয়ারের বাচ্চা’ মিন করে কথাটি বলা হয়? কেউ যখন কাউকে বাঘের বাচ্চা বলে, তখন এটা বাহাদুর বা সাহসী অর্থ ক্যারি করে। বাঘের বাচ্চা বলে সাহসী এবং শক্তিমান বোঝানো হয়।

    দুররুল মুখতারের ইবারতের মর্ম হলো, ইমাম তাঁকে বানাও যার তাকওয়ার ব্যাপারটা স্বভাবজাত। ইমামের বউ যদি সুন্দরী নাও হয়, তবুও ইমামকে তাকওয়া এখতিয়ার করতে হয়। তবে এই তাকওয়াটা হয় নফসের বিপরীত দাঁড়িয়ে। ইমামও মানুষ। ইমামেরও মন চায় সুন্দরী মেয়ে দেখলে তার দিকে তাকাতে। কিন্তু আল্লাহর ভয়ের কারণে সেটা করতে পারেন না। কিন্তু ইমামের নিজের আপন বউ যদি সুন্দরী হয়, তাহলে অন্যদিকে তাকানোর আর ইচ্ছাই করবে না তাঁর। বরং বাইরে থাকলে মন ছটফট করবে কখন ঘরে যাবেন। এমন ইমামের মধ্যে তাকওয়ার ব্যাপারটা থাকবে বেশি এবং স্বয়ংক্রীয়। আর তাকওয়াটাই একজন ইমামের অলংকার।

    সারকথা, দুররুল মুখতারের বক্তব্য হলো ইমাম তাকে বানাও, যার বউ সুন্দর। অর্থাৎ, যে তোমাদের মাঝে সবচে ভালো মানুষ। অর্থাৎ যার মাঝে তাকওয়া বেশি। অর্থাৎ যে বেশি পরহেযগার। এখানে সমস্যাটা কোথায়?
    —- হুমুল্লাজিনা, পৃষ্ঠা-৩৫-৪০

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম