• শিরোনাম


    ইবাদাতের বসন্তকাল মাহে রমজান : মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস, অতিথি লেখক | ২৫ এপ্রিল ২০২০ | ২:১২ পূর্বাহ্ণ

    ইবাদাতের বসন্তকাল মাহে রমজান : মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    সৌভাগ্যের অমিয় বার্তা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর কাছে শুভাগমন করলো পবিত্র মাহে রমজান। করোনা ভাইরাসের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও রমজান মুবারাক প্রতিটি মুমিন হৃদয়ে সান্ত্বনার পরশ বুলিয়ে দিবে নিঃসন্দেহে। আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য এমন কিছু শুভসময় নির্ধারণ করেছেন, যখন তাঁর রহমতের বারিধারা অবিরত বর্ষিত হতে থাকে। প্রিয় বান্দাগণ তখন মারেফাতের সাগরে ডুব দেন, আর গোনাহগার-পাপীরা নাজাতের রজ্জু আকড়ে ধরে। তন্মধ্যে রমজান মাস সর্বশীর্ষে। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সম্মানিত এবং সর্বাধিক বরকতময় মাস। তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। গোটা মাসজুড়ে রহমত ও মাগফিরাতের ফল্গূধারা প্রবাহিত হয় এবং মুক্তির অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। মাহে রমজানকে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মাহাত্ম দ্বারা বৈশিষ্টমণ্ডিত করেছেন। সেসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যতই চিন্তা করা যায়, ততই এ মাসের মহিমা ও গুরুত্ব উদ্ভাসিত হয়। পবিত্র কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ হওয়া, মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদরসহ বহু ফজিলতের সমাবেশ ঘটেছে রমাজানুল মুবারাকে। এই মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, এই মাসে দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। সর্বোপরি এই মাসে মাগফেরাত লাভের অফুরন্ত সুযোগ আসে। আমি এই প্রবন্ধে প্রথমেই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মাহে রমজানের মহিমার কথা আলোচনা করে তারপর কতিপয় ইবাদাত সম্পর্কে আলোকপাত করবো।

    আল্লাহ তায়ালা এ মাসে মানুষের জন্য হেদায়াতের আলোকবর্তিকা কুরআন মাজিদ নাজিল করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
    شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَان
    অর্থাৎ, মাহে রমাযান, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন যা মানুষের জন্য হিদায়াত ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং (যা আসমানী) হিদায়াত ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়কারী।” (সূরা বাকারা ,১৮৫)
    রমজান মাসে রয়েছে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা বলেন :
    “لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ (3) تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ (4) سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ (5)
    “ লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনি উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।” (সূরা আল-কদর : ৩-৫)
    হাদীস শরীফে নবী সাল্লাল্লাহু আলাআইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
    إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة وغلقت ابواب جهنم وصفدت الشياطين
    “যখন মাহে রমাযানের আগমন হয় তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়। আর শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৭৯)
    অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
    “ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ মাহে রমজানের প্রথম রজনির আগমন ঘটলে শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এ মাসে আর তা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও ! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও ! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।” [ তিরমিজি ]
    পবিত্র রমজান মাসের মূল ইবাদত হলো, সিয়াম সাধনা তথা রোজা রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
    অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে রোযা, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যেন তোমরা আত্মরক্ষা করতে পার। (গুনাহ থেকে এবং জাহান্নামের অগ্নি থেকে)।। -( সূরা বাকারা, আয়াত- ১৮৩)
    আল্লাহ তাআলা আরো বলেন-
    فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
    অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যে এ মাসে উপস্থিত হয়, সে যেন মাসভর রোযা রাখে। (সূরা বাক্বারা ২:১৮৫)
    হযরত সাহল বিন সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, “ জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’। ওই দরজা দিয়ে কেবল রোজাদারগণই প্রবেশ করবে।”-(বুখারী: ১৭৭৫)।
    হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল সা বলেন, “ ( রমজান মাসে) আদম সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের সওয়াব দশগুণ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা, রোজা শুধু আমার জন্য। আর আমিই এর প্রতিদান (যত ইচ্ছা) প্রদান করবো।।
    – ( বুখারী: ১৮০৫ , ইবনে মাজা: ১৬৩৮)।
    এ মাসের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, রাত্রে সালাতুত তারাবীহ আদায় করা।
    হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবী নামাযকে আমাদের জন্য অপরিহার্য করেননি। তবে তিনি উৎসাহিত করেছেন এবং বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমযানের রাতে (নামাযে) দাঁড়ায় তার পূর্বকৃত গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস ২০০৯)



    আরেকটি বরকতপূর্ণ কাজ হলো, সেহরী খাওয়া।
    হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেন, তোমরা সাহ্‌রি খাও, কেননা সাহ্‌রিতে বরকত রয়েছে।। -(বুখারি শরিফ, হাদিস: ১,৮০১)

    পূণ্যময় অন্য একটি কাজ হলো, ইফতার করা এবং অন্যকেও করানো। উভয়টির ব্যাপারেই হাদীসের তাকীদ পাওয়া যায়।
    হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আল-জুহানি (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে; রোজাদারের সওয়াব থেকে একটুও কমানো হবে না।” -(সুনানে তিরমিযি, ৮০৭)
    অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “ রোযাদার দুটি আনন্দ উপভোগ করে। যখন সে ইফতার করে তখন ইফতার খাবার গ্রহণ তাকে আনন্দিত করে। আর যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাত করে তখন তার রোযা তাকে আনন্দিত করে “-সহীহ বুখারী
    এ ছাড়াও রমজান মাসে দান-সাদাকা, কুরআন তিলাওয়াত, দোআ প্রভৃতি নেক আমলের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রমজান মাস নিজকে গড়ে তোলার এক মোক্ষম সুযোগ। মুক্তির অবারিত সুযোগ পেয়েও যারা নিজেদের শুধরে নিতে পারল না,তাদের চেয়ে হতভাগা আর কেউ হতে পারেনা। রাসূল সা. বলেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমযান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না। (-মুসলিম, হাদীস-২৫৫১ ও তিরমিযী,হাদীস-৩৫৪৫)।।
    রোজা আমাদেরকে সংযমের শিক্ষা দেয়। রোজার উদ্দেশ্য শুধু অনাহারে থাকা নয়। বরং দৈহিক ও মানসিক উভয়বিধ সংযমই রোজার মূল লক্ষ্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও মিথ্যা আমল বর্জন করেনি, তার এই পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।।-(বুখারি শরিফ, হাদিস: ১,৭৮২)
    অতএব, আমাদেরকে সর্বপ্রকার গোনাহ বর্জনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। বিশেষ করে যেসব গুনাহের কাজ প্রকাশ্যে ও ব্যাপকভাবে করা হয় সেগুলো থেকে নিজেও বিরত থাকা, অন্যকেও বিরত রাখা। যেমন: গান-বাজনা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা, বেপর্দা চলাফেরা, দিনের বেলা হোটেল-চাস্টলেু পানাহার চালু থাকা ইত্যাদি। অযথা বাইরে ঘোরাফেরা, আড্ডা ও গল্প-গুজবে লিপ্ত না হয়ে একাগ্রতার সাথে ইবাদত-বন্দেগী করাই ঈমানের দাবী। আরো মনে রাখতে হবে, রমজান হলো সহমর্মিতার মাস। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে রমজানকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জন্য কষ্টের মাসে পরিণত করা কোন মুসলিম ব্যবসায়ীর কাজ হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই নেয়ামতের মূল্যায়ন করার এবং প্রতিটি মুহূর্তকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে লাগানোর তাওফীক দান করুন, আমীন।।

    লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস
    প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক: শাহবাজপুর, বি-বাড়িয়া, বাংলাদেশ।
    ২৫/৪/২০২০ইং, শনিবার।।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম