• শিরোনাম


    আল মাহমুদ-আপাদমস্তক এক ধর্মভীরু কবি: এস এম শাহনূর

    | ১১ জুলাই ২০১৯ | ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

    আল মাহমুদ-আপাদমস্তক এক ধর্মভীরু কবি: এস এম শাহনূর

    আল মাহমুদ,একটি নাম,একটি ইতিহাস
    জীবনী,প্রেরণামূলক গল্পের ঝুলি।আল মাহমুদের কবিতা এবং গদ্যে ফুটে উঠেছে আধ্যাত্মিকতার নানা দিক। বাংলা কবিতার রাজধানীকে কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের একক কৃতিত্ব যাঁর তিনি আল মাহমুদ।শেষ বয়সে তিনি বারবার বলেছেন, এখন আমার চোখ আর আমার চোখ নেই। বাইরের চোখ দিয়ে মানুষ যা দেখে আমি দেখি তারও বেশি কিছু। দেখি এ জগৎ ও জগতের ভেতর-বাহির।আল মাহমুদ লেখেন-এখন চোখ নিয়েই হলো আমার সমস্যা। যেন আমি জন্ম থেকেই অতিরিক্ত অবলোকন শক্তিকে ধারণ করে আছি।
    কানা মামুদের উড়ালকাব্যে তিনি লেখেন-এখন অন্ধ হয়ে গিয়ে অন্তর্দৃষ্টি শব্দটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। অন্তর্দৃষ্টি যেন হারপুন নিয়ে খেলা। যেন একটি দুর্ধর্ষ মাছকে বল্লম দিয় গেঁথে ফেলা। …ভবিষ্যৎ দেখতে হলে কে বলেছে যে পরিচ্ছন্ন চোখই দরকার। ঘষা কাচের মতো রহস্যময় চোখ চেয়েছিলাম আমি। আমার প্রভু আমাকে তা দিয়েছেন।

    ১৯৯৮ সালে কবির সাথে আমার প্রথম দেখা।কুশলাদি বিনিময়। কথার এক পর্যায়ে আমি কবিকে দাদু বলে সম্বোধন করেছিলাম।তিনি মাথা নেড়ে আমার দাদু ডাকের আনন্দময় সাড়া দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বহুবার দাদুর সাথে দেখা করার ইচ্ছে মনে জেগেছে। কিন্তু ব্যক্তি জীবনের ব্যস্ততায় তা আর হয়ে উঠেনি।আমার মত এ প্রজন্মের অনেকের কাছেই তিনি প্রিয় কবি,প্রিয় দাদু ভাই আল মাহমুদ।তিনি ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই বাবা মীর আবদুর রব এবং মা রওশন আরা মীরের ১৪ বছরের দাম্পত্য জীবনের আশা আকাঙ্খা পরিপূর্ণ করতে প্রথম পৃথিবীর আলো বাতাসে এসে চিৎকার করলেন।আর ঐ চিৎকারের শব্দ শুনেই সকল বাঙলা,বাঙালী জেনে ছিল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবির আগমনী বার্তা।
    আজ ১১ জুলাই কবির ৮৪তম জন্মদিন।



    কবির নিজের শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্পর্কে ‘ওগো মোর বনহংসী’তে কবি তাঁর পরিচয় লেখেন, ‘আমার জন্ম হয়েছিল একটি নদীর পাড়ে। একটি ছোট শহরে। শহরটিকে সঙ্গীতের শহর বলা হতো। ভাবি আমি কবি না হলে নিশ্চয়ই সঙ্গীতজ্ঞ হতাম। তারের বাদ্য আমার হাতে ঝঙ্কার দিয়ে উঠত।’

    কবির জাগতিক শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি দাদি বেগম হাসিনা বানু মীরের কাছে।আল মাহমুদ বলেন, ‘আমি বলতে শিখেছি আমার দাদির কোলে বসে। দাদি যেভাবে গল্প শোনাতেন সেভাবেই গল্প বলে উপন্যাস লিখে আজ বিখ্যাত হয়ে উঠেছি।’ ‘বাবার কাছ থেকে নিয়েছি ধর্মীয় শিক্ষা।আমার আব্বা একজন দরবেশ মানুষ ছিলেন। আধ্যাত্মিক ধরনের মানুষ ছিলেন। নিয়মিত নামাজ রোজা করতেন। তাহাজ্জুদ গোজারি মানুষ ছিলেন। ছিলেন নাক বরাবর শরিয়তপন্থী।’
    ‘আধ্যাত্মিক মানুষ হওয়ার কারণে আব্বার কাছে ফকির-দরবেশদের আসা-যাওয়া ছিল। বড়ই অদ্ভুত ছিল তাদের আচার-আচরণ। আমার শিশুমনে গভীর প্রভাব ফেলে তারা।

    আল মাহমুদ বলেন, বামরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম ঠিক, কিন্তু নাস্তিক ছিলাম না কখনই। আমাদের সঙ্গে যারাই মার্কসিস্টে প্রভাবিত হয়েছে, সবাই ঘরে ফিরেছে। আফতাব চৌধুরীর মতো লোক পর্যন্ত শেষ রাতে উঠে জিকির করেন হু আল্লাহু…। হু আল্লাহু…।

    কারাগারে তিনি পুরো কোরআন অধ্যয়ন করেন। , ‘কোরআন পড়ার পর আমার মনে হল, কোরআন শরিফ আগামী দিনের মানব সমাজের জন্য পৃথিবীতে বসবাসের একমাত্র সঠিক দলিল। মার্কসবাদ আমি পড়ে এসেছি বলে আমার কোরআন বুঝতে সুবিধা হয়েছে। যেমন বণ্টনপ্রণালি। আমি যেহেতু মার্কসিস্ট, আমাকে ওই বণ্টননীতিটাই নাড়া দিল। এবং খুব নাড়া দিল। এত নাড়া দিল যে, আমি কয়েকদিন ঘুমাতেই পারিনি।’ ছন্দের সুরে তিনি লিখলেন সে কথা-

    পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে

    আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হায় এ ছিল সত্যিকার ঘুম

    কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখনই

    সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠল, যার ফাঁক দিয়ে

    যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বল, স্বপ্ন।

    কবি ব্যক্তি জীবনে বায়তুশ শরফ দরবার শরিফের পীর শাহ সুফি আবদুল জব্বারের কাছে বায়াত গ্রহণ করেন।আধ্যাত্মিকতার পাঠ নেন।কবির ভাষায়-
    তিনি আমাকে দুটি মাত্র উপদেশ ঠিকমতো মেনে চলতে শিখিয়েছিলেন।

    এক. সিজদায় মাথা ঠেকিয়ে রাখার সময় রক্ত-মাংসসহ নিজের ভেতরটাকে একেবারে উপুড় করে দেয়া।

    দুই. কবির অহঙ্কার ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ফেলে দিয়ে একেবারে আল্লাহ প্রেমিকদের ভিড়ে ফতুর হয়ে মিশে যাওয়া।

    তার কাছে শিখেছিলাম কী করে নিজের আত্মাকে কেবল মানুষের জন্য দরদি করে তুলতে হয়।

    অতঃপর কবি লিখলেন-
    অথচ ঘুমের মধ্যে কারা যেন, মানুষ না জিন আমার কবিতা প’ড়ে ব’লে ওঠে, আমিন, আমিন

    “কোনো এক ভোর বেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
    মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
    অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
    ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।”
    (আল মাহমুদ)
    বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য কবি আল মাহমুদ ধুলোমাটির এই পৃথিবীর সমস্ত মায়া ছিন্ন করে বিদায় নিয়েছেন। লম্বা সময় ধরে অসুস্থ এই কবিকে নিয়ে সাহিত্যপ্রেমীদের সকল দুশ্চিন্তার অবসান ঘটেছে ফাল্গুনের তৃতীয় রাতে। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে হারিয়ে গেছেন এই মহান কবি চিরতরে। আল্লাহ্‌ কবির সুপ্ত ইচ্ছে পূরণ করেছেন; শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে বিদায় নিয়েছেন কবি আল মাহমুদ। ইচ্ছে পূরণ হলো হয়তো!

    💻এস এম শাহনূর
    উইকিপিডিয়ান,কবি ও গবেষক।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম