• শিরোনাম


    আমাদের সংসদ ভবন বিশাল প্রশস্ত ও সোজা জায়গায়ও এমন বাঁকা করে নির্মিত হল কেন?

    লেখক: মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী , চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক, ঢাকা সেন্টার ফর দাওয়াহ এন্ড কালচার | ১৬ জুন ২০২০ | ১:৩০ পূর্বাহ্ণ

    আমাদের সংসদ ভবন বিশাল প্রশস্ত ও সোজা জায়গায়ও এমন বাঁকা করে নির্মিত হল কেন?

    বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। নতুন চাঁদের মতো ক্রিসেন্ট লেকের উপর এটি যেন একটি ধ্রুবতারা। নয় তলা বিশিষ্ট আবরণী কাঠামোর ভেতর অনেকগুলো যুথবদ্ধ বহুতল বিল্ডিং রয়েছে বিশাল এ ভবনটিতে। কিন্তু আমাদের সংসদ ভবনটিতে প্রবেশের সময় যে কেউ দেখে বিস্মিত হয়ে যায়, ভাবে এটির মূল প্রবেশ পথ এবং গোটা কাঠামোটি কেন এমন বাঁকা। আকাশ থেকে দেখলে বোঝা যায় এটি কতটা বাঁকা। নিচ দিয়ে বিমান উড়িয়ে নিলে বা কপ্টারে বসে এ দৃশ্য যে কাউকে বিস্মিত করবে। সরাসরি সামনে থেকে দেখলেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ভবনটি জমিনের চতুষ্কোণ ল্যান্ডস্কেপ বিবেচনায় অস্বাভাবিক বাঁকা। পাঠক, সংসদ ভবন আসলেই কিন্তু বাঁকা। এর ঐতিহাসিক কারণটি আমি প্রথমবারের মতো এবারই উল্লেখ করেছি।

    এর কারণ আমাদের জাতীয় সংসদের মূল মসজিদ। মসজিদটি সোজা সোজা কাতারের এবং সঠিক কিবলামুখি রাখতেই গোটা ভবনটি বাঁকা করা হয়েছে। এই সংসদ নিজে বাঁকা হয়ে নিজের মধ্যমনি ও প্রাণটি ফিরিয়ে রেখেছে পবিত্র কাবার দিকে। ইতিহাসের এ অমূল্য তথ্যটি আমি ১৯৯১ সালের কোনো একদিন জামাতে আসরের নামাজ পড়ার পর জাতীয় সংসদের মূল মসজিদে বসে নতুন করে আমার আব্বাজান মুফাক্কিরে ইসলাম হজরতুল আল্লাম মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ. এর জবান থেকে শুনতে পাই। তিনি আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন হয়েও বাঁকা কেন, এ বিষয়টি নিয়ে প্রফেসর বি চৌধুরী সাহেবসহ কিছু নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলছিলেন। বি চৌধুরী সাহেব তখন শিক্ষামন্ত্রী, পরে সংসদের উপনেতা। এরপর প্রেসিডেন্ট। আব্বা তখন সংসদ সদস্য। তিনি বলেছিলেন, সংসদ ভবনে মসজিদ রাখার বিষয়ে তরুণ আলেম ও রাজনীতিক হিসাবে তারও ভুমিকা ছিল। স্পিকার তমিজউদদীন খান আব্বাকে অনেক বিষয় জানাতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরামর্শ করতেন। সংসদ এলাকার দক্ষিণ পশ্চিম কোনে জাতীয় কবরস্থানে স্পিকার মৌলভী তমিজউদদীন খানের কবর। এখানে প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার ও খান এ সবুর সাহেবকেও দাফন করা হয়েছে।



    আমাদের সংসদ ভবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। মার্কিন স্থপতি লুই কান যখন এর নকশা করেন তখন তার নকশায় মসজিদ ছিলনা। ততকালীন স্পিকার মৌলবী তমিজউদদীন খান এ নকশায় মসজিদ সংযুক্ত করার নির্দেশ দিলেন। তৈরী ও পূর্ণাঙ্গ নকশায় নতুন করে মসজিদের জায়গা করা এবং নকশা নিখুঁত রেখে মসজিদ বসানো ছিল লুই কানের জন্য কঠিন পরীক্ষা। বড় সমস্যা দেখা দিল, কিবলা ঠিক করে মসজিদ বানালে গোটা সংসদ ভবনটি বানাতে হবে আগের পরিকল্পনার তুলনায় বহু ডিগ্রি বাঁকা করে। স্পিকার তমিজউদদীন খান বললেন, মুসলমানদের পার্লামেন্ট হাউস। মসজিদ বাঁকা করা চলবে না। কিবলাও ঠিক রাখতে হবে আর মসজিদটিও হতে হবে সোজা সোজা কাতারের। প্রয়োজনে সংসদ ভবনটি বাঁকা করে নির্মাণ করা হবে কিন্তু মসজিদ থাকতে হবে সঠিক ডাইরেকশানে এবং সোজা কাতারের। যেই কথা সেই কাজ। এমনই করা হল।

    বিস্ময়কর ব্যাপার মনে হলেও দর্শক লক্ষ করলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে, আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনটি লেকের ওপর বাঁকা করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর কারণ এটিই, যাতে এর ভেতরকার প্রধান মসজিদটি থাকে সোজা কাতারের এবং কিবলামুখী। এটি যখনকার ঘটনা তখন আমার একাধিক আত্মীয়-আপনজন এ দেশের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্য। তারা এ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সাক্ষী সেসময়কার আমলা ও নেতৃবৃন্দ।জাতীয় সংসদ ভবনের অবকাঠামো, অবস্থান ও বাস্তব রূপের পাশাপাশি আমাদের জাতীয় ইতিহাসও এর সাক্ষী হয়ে আছে। অতএব, এমন একটি কিবলা ও মসজিদকেন্দ্রিক ভবনের সংসদীয় কার্যক্রম ও অধিবেশনে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-মুনাজাত হবে, একদিন এটি পূর্ণাঙ্গ শরীয়ার আলোকে পরিচালিত হবে, এটাই তো বিশ্বাস, চেতনা ও ঐতিহ্যের দাবি।

    Maulana Ubaidurrahman Khan Nadwi (লেখকের ‘জীবন খাতার কয়েক পাতা’ বই থেকে)

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম