• শিরোনাম


    অর্ধপৃথিবীর শাসক ওমর (রা.) এর জীবন ও কর্ম:

    লেখক: মাহবুবুর রহমান নোমানি | ০৪ জানুয়ারি ২০১৯ | ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ

    অর্ধপৃথিবীর শাসক ওমর (রা.) এর জীবন ও কর্ম:

    ‘স্মরণ রেখ, আমি তোমাকে জনগণের ওপর নির্দেশদাতা ও স্বেচ্ছাচার হিসেবে নিয়োগ দিইনি। আমি তোমাকে একজন নেতা হিসেবে পাঠিয়েছি, যাতে মানুষ তোমাকে অনুসরণ করতে পারে। জনগণের অধিকার আদায় করো, যাতে তারা অন্যায়ে পতিত না হয়। সবলরা যাতে দুর্বলদের ওপর জুলুম করার সাহস না পায়, সে জন্য সবার অবাধ দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ রাখবে। আর নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চ মনে করো না, যা স্বেচ্ছাচারী শাসকরা করে থাকে।’

    নাম ওমর। উপাধি ফারুক। এ উপাধি স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে দিয়েছেন। ফারুক অর্থ সত্য ও মিথ্যার প্রভেদকারী। তার ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ইসলাম ও কুফরের মধ্যে প্রকাশ্য বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি ইসলাম কবুল করেই চিন্তা করলেন, মক্কাবাসীর মধ্যে আল্লাহর রাসুলের সবচেয়ে কট্টর দুশমন কে আছে। ইসলাম গ্রহণের কথাটা তাকেই আগে জানাবেন। আবু জাহেলকে টার্গেট করে তার ঘরের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লেন। আবু জাহেল বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কী মনে করে? ওমরের জবাব, আপনাকে জানাতে এসেছিÑ ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর ঈমান এনেছি।’ এভাবে তিনি মক্কার পৌত্তলিক শক্তিকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘ওমর ইসলাম গ্রহণ করেই কোরাইশদের সঙ্গে বিবাদ আরম্ভ করে দিলেন।’ সুহাইব (রা.) বলেন, ওমরের ইসলাম গ্রহণের পর আমাদের সঙ্গে কোনো কাফের দুর্ব্যবহার করলে আমরা প্রতিশোধ নিতাম এবং আমাদের ওপর আক্রমণ হলে প্রতিহত করতাম। মোটকথা, ওমরের ইসলাম গ্রহণে মুসলমানদের শক্তি অর্জিত হয়েছিল এবং ইসলাম মক্কায় প্রকাশ্য রূপ নিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা তার দ্বারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে প্রার্থক্য করে দিয়েছিলেন। তাই তিনি ফারুক। (তাবাকাত : ৩/২৭০)।



    ইসলাম গ্রহণের অবিস্মরণীয় ঘটনা
    ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণ এক চিত্তাকর্ষক ঘটনা। প্রথম প্রথম তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুলের ঘোর দুশমন। নবীজির তওহিদ ও রিসালাতের দাওয়াত তার কাছে মিথ্যে মনে হতো। একদিন তিনি মহানবীকে হত্যার উদ্দেশ্যে তরবারি হাতে বের হয়ে পড়লেন। পথিমধ্যে পরিচিত এক লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। তার মাধ্যমে জানতে পারেন, স্বীয় বোন ও ভগ্নিপতি দুজনই ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছেন। এ খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে বোনের বাড়ির দিকে পথ বদল করলেন। খাব্বাব (রা.) তখন তাদের কোরআন পড়াচ্ছিলেন। ওমরের আভাস পেয়ে তারা কোরআনের পৃষ্ঠাগুলো লুকিয়ে ফেললেন। ওমর (রা.) ঘরে ঢুকেই বোন ও ভগ্নিপতিকে বেদম মারতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে বোন বললেন, জীবন চলে গেলেও সত্য ধর্ম ত্যাগ করব না। বোনের দৃঢ়তা দেখে ওমর হতভম্ব হয়ে খাটের ওপর বসলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা কী যেন পড়ছিলে? বোন তাকে গোসল করে পবিত্র হয়ে আসতে বললেন। ওমর (রা.) গোসল সেরে পবিত্র হয়ে সূরা ত্বহার কিছু অংশ পড়লেন। আল্লাহর কালামের অপূর্ব বাণী ওমরের মনে দারুণ প্রভাব ফেলে। তার ক্ষুব্ধ মনকে প্রশান্ত করে। তিনি ইসলাম গ্রহণের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দরবারে। আল্লাহর কী অপার কুদরত! যাঁকে হত্যা করার জন্য উন্মুুক্ত তরবারি হাতে বের হয়েছিলেন তাঁর কাছেই ইসলামপ্রেমে ছুটে এলেন ওমর। তাকে দেখেই রাসুল (সা.) বললেন, ওমর, তুমি কি বিরত হবে না? তারপর দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! ওমর আমার সামনে। তুমি ওমরের দ্বারা দ্বীনকে শক্তিশালী করো। ওমর (রা.) তখনই বলে ওঠেনÑ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসুল। ওমরের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! ওমরের ইসলাম গ্রহণে আসমানের অধিবাসীরা উৎফুল্ল হয়েছে। (তাবকাতে ইবনে সাদ : ৩/২৬৯)। ওমরের ইসলাম গ্রহণে মক্কায় মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে যায়। মুসলমানরা প্রকাশ্যে কাবাঘরে নামাজ আদায় করতে শুরু করেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘ওমরের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের বিজয়। তার হিজরত আল্লাহর সাহায্য এবং তার খেলাফত আল্লাহর রহমত।’

    মদিনার পথে গৌরবময় হিজরত
    ওমরের মদিনায় হিজরত ছিল অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। অন্যদের ছিল চুপে চুপে। আর ওমরের ছিল প্রকাশ্যে। তার হিজরতে ছিল কোরাইশদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহের সুর। তিনি মদিনায় যাত্রার আগে প্রথমে কাবাঘর তাওয়াফ করেন। তারপর কোরাইশদের আড্ডায় গিয়ে ঘোষণা করেন, আমি মদিনায় চলছি। কেউ যদি তার মাকে পুত্রশোকে কাতর করতে চায় সে যেন আমার পথ আগলে ধরে। এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি মদিনার পথে পাড়ি দেন। সঙ্গে তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের বিশজন সদস্য।

    নবীজির দৃষ্টিতে ওমর (রা.)
    ওমর ছিলেন নবীজির একান্ত সহচর। নবীজির জীবনে যত চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে কিংবা সময়ে সময়ে নবীজি (সা.) যত আইন ও বিধান প্রবর্তন করেছেন এবং ইসলাম প্রচারের জন্য যত পন্থা অবলম্বন করেছেন তার একটি ঘটনাও এমন নেই, যা ওমরের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত সম্পাদিত হয়েছে। তার কর্মময় জীবন ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বদর, ওহুদ, খন্দকসহ সব যুদ্ধেই তিনি নবীজির সঙ্গে ছিলেন। যেসব যুদ্ধে নবীজি নিজে অংশগ্রহণ করেননি, এমন বেশকিছু যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন ওমর (রা.)। তার ফজিলত ও মর্যাদার কথা কোরআন ও হাদিসে এত অধিক বর্ণিত হয়েছে, যা একটি প্রবন্ধে লেখা অসম্ভব। স্বয়ং আল্লাহর কাছে তার স্থান ছিল অতি উচ্চে। তার সমর্থনে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বেশ ক’টি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। তার অনন্য গুণগুলোর প্রতি লক্ষ করেই নবীজি (সা.) বলেছেনÑ ‘আমার পরে কেউ নবী হলে ওমরই হতো।’

    আবু বকরের হাতে বায়াত
    নবীজির ওফাতের পর খেলাফতের বিষয় নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে ওমর (রা.) দ্রুত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। ফলে খলিফা নির্বাচনের মহাসংকট সহজেই কেটে যায়। তিনি ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর উপদেষ্টা ও বিচার বিভাগের প্রধান। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তার ব্যবসায় মনোযোগ দিলে ওমর (রা.) বললেন, আপনি ব্যবসায় মনোনিবেশ করলে দেশ চালাবেন কীভাবে? আবু বকর বললেন, তাহলে আমার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হবে কোত্থেকে? ওমর (রা.) অন্যান্য সাহাবির সঙ্গে পরামর্শ করে খলিফার জন্য ভাতা চালু করেন।

    খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ
    আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মৃত্যুর আগেই পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যাওয়াকে কল্যাণকর মনে করলেন। তার দৃষ্টিতে ওমর (রা.) ছিলেন খেলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি। এরপরও তিনি উঁচুস্তরের সাহাবিদের সঙ্গে এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন। প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ডেকে ওমরের ব্যাপারে মতামত জিজ্ঞেস করেন। কেউ কেউ ওমরের কঠোরতার আপত্তি করলে তিনি বলতেন, দায়িত্ব কাঁধে পড়লে কঠোরতা কমে যাবে। এরপর তিনি লোকদের সমবেত করে বললেন, ‘যে ব্যক্তিকে আমি আপনাদের জন্য মনোনীত করে যাচ্ছি তার প্রতি কি আপনারা সন্তুষ্ট? আল্লাহর কসম, মানুষের মতামত নিতে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। আমার কোনো নিকটাত্মীয়কে এ পদে বহাল করিনি। আমি ওমর ইবনুল খাত্তাবকে আপনাদের খলিফা মনোনীত করেছি। আপনারা তার কথা শুনুন এবং তার আনুগত্য করুন।’
    হিজরি ১৩ সনের ২২ জমাদিউস সানি মোতাবেক ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ আগস্ট থেকে শুরু হয় ওমরের শাসনকাল।

    শাসক হিসেবে ওমর (রা.)
    খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ওমরের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল প্রজাদের মন জয় করা। তিনি রাতের আঁধারে ঘুরে ঘুরে প্রজাদের খোঁজখবর নিতেন। তার প্রজাপালনের বহু ঘটনা ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে। তার দক্ষ শাসন ব্যবস্থা ও ইনসাফের কথা ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে। আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম-অমুসলিম সবার মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ইসলামি সাম্রাজ্য বৃদ্ধিকরণ। অকল্পনীয়ভাবে তিনি তার খেলাফতের সীমানা বাড়াতে শুরু করেন। সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। মাত্র দশ বছরের স্বল্প সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন অর্ধজাহানের শাসক। বিশাল সাম্রাজ্যকে তিনি কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক সরকারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সবকিছু পরিচালিত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। ওমর (রা.) নিজে প্রাদেশিক সরকার তথা গভর্নর নিয়োগ করতেন। নিয়োগের সময় তিনি গভর্নরদের প্রতি নির্দেশনা দিতেনÑ
    ‘স্মরণ রেখ, আমি তোমাকে জনগণের ওপর নির্দেশদাতা ও স্বেচ্ছাচার হিসেবে নিয়োগ দিইনি। আমি তোমাকে একজন নেতা হিসেবে পাঠিয়েছি, যাতে মানুষ তোমাকে অনুসরণ করতে পারে। জনগণের অধিকার আদায় করো, যাতে তারা অন্যায়ে পতিত না হয়। সবলরা যাতে দুর্বলদের ওপর জুলুম করার সাহস না পায়, সেজন্য সবার অবাধ দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ রাখবে। আর নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চ মনে করো না, যা স্বেচ্ছাচারী শাসকরা করে থাকে।’

    উল্লেখযোগ্য কিছু অবদান
    ওমরের শাসনামল নানা কারণে ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। তিনিই সর্বপ্রথম বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) গঠন করেন। যেখান থেকে রাষ্ট্রের সব নাগরিককে ভাতা প্রদান করা হতো। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য বিশেষ বিভাগ গঠন করেন। এ বিভাগ প্রশাসনিক আদালত হিসেবে কাজ করত এবং এর আইনি কর্মকা- তিনি নিজে তদারকি করতেন। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তিনি পুলিশ বাহিনী নিয়োগ দেন। সেনাবাহিনীকে তিনি বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেন। দুর্নীতি রোধের জন্য কর্মকর্তাদের উচ্চ বেতন দিতেন। মদপানে আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন। আদমশুমারি তথা নাগরিক তালিকা তৈরি করেন। কৃষির উন্নয়নের টাইগ্রিস নদী থেকে বসরা পর্যন্ত খাল খননের ব্যবস্থা করেন। তিনিই সর্বপ্রথম হিজরি সন প্রবর্তন করেন।

    পৃথিবীকে বিদায়
    মুগিরা ইবনে শুবার অগ্নি-উপাসক দাস আবু লুলু ফিরোজ ফজরের নামাজরত অবস্থায় এ মহান খলিফাকে ছুরিকাঘাত করে। আহত হওয়ার তৃতীয় দিনে হিজরি ২৩ সনের ২৭ জিলহজ বুধবার তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ৬ সদস্যের একটি শূরা কমিটি গঠন করে যান। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর রওজা আকদাসে আবু বকর (রা.) এর পাশে তিনি শায়িত আছেন।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম